হরমুজ সংকটে কুয়েতের তেল অর্থনীতি বড় বিপর্যয়ে

 প্রকাশ: ১৪ অগাস্ট ২০২৬, ১১:৫৭ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

হরমুজ সংকটে কুয়েতের তেল অর্থনীতি বড় বিপর্যয়ে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধের জেরে পারস্য উপসাগর দিয়ে তেল রপ্তানি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কয়েক দশকের সবচেয়ে বড় সংকটে পড়েছে কুয়েতের তেল খাত। ছয় মাস ধরে চলা সংঘাতে কুয়েতের তেল রপ্তানি ব্যাপকভাবে কমে গেছে, আর দেশটির অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল।

কুয়েতের অর্থনীতির মূল ভিত্তি তেল। সরকারের মোট রাজস্বের ৯০ শতাংশের বেশি এবং প্রায় পুরো রপ্তানি আয়ই নির্ভর করে নিরবচ্ছিন্ন অপরিশোধিত তেল বিক্রির ওপর। বিশ্বের মোট তেল মজুতের প্রায় ৬ শতাংশও রয়েছে দেশটিতে।

সৌদি আরব বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল রপ্তানির জন্য কুয়েতের কোনো পাইপলাইন নেই। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল পাঠাতে দেশটিকে বাধ্যতামূলকভাবে এই বিতর্কিত নৌপথের ওপর নির্ভর করতে হয়।

কুয়েত পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (কেপিসি) প্রধান নির্বাহী শেখ নওয়াফ সৌদ আল-সাবাহ বলেন, ১৯৯০ সালে ইরাকের আগ্রাসনের পর থেকে তেল খাতে এটাই কুয়েতের সবচেয়ে কঠিন ও বড় সংকট।

১৯৯০ সালের আগ্রাসনের সময় ইরাকি বাহিনী পিছু হটার আগে শত শত তেলকূপে আগুন ধরিয়ে দেয়, বিশাল তেল সংরক্ষণ ট্যাংক ধ্বংস করে এবং শোধনাগারে হামলা চালায়। এতে কুয়েতের তেল অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল।

যুদ্ধের শুরুতেই রপ্তানি বিপর্যস্ত

এবার সেই মাত্রার ধ্বংস না হলেও যুদ্ধের প্রভাব থেকে রেহাই পায়নি কুয়েত। যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিনের মধ্যেই রাষ্ট্রীয় কেপিসি ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করে। যুদ্ধ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো অনিবার্য পরিস্থিতিতে চুক্তির বাধ্যবাধকতা পূরণ করতে না পারলে প্রতিষ্ঠানকে আইনি সুরক্ষা দেয় এই ব্যবস্থা।

জুনে সেই ঘোষণা প্রত্যাহার করা হয়। তবে এর মধ্যে কুয়েতের পানি শোধনাগার ও জ্বালানি স্থাপনায় ইরানের একাধিক দফা হামলা হয়েছে। পেট্রোলিয়াম অবকাঠামোও হামলার লক্ষ্য ছিল। পাশাপাশি কুয়েতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করেও হামলা চালানো হয়েছে।

কেপিসির প্রধান নির্বাহী আল-সাবাহ এএফপিকে বলেন, ‘এই সংকট আমাদের সামনে নতুন এক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।’ এপ্রিলে কেপিসির সদর দপ্তরে ড্রোন হামলার পর তিনি একটি অস্থায়ী কার্যালয়ে কাজ করছেন।

যুদ্ধের আগে কুয়েত প্রতিদিন ২৬ লাখ ব্যারেলের কিছু বেশি তেল উৎপাদন করত। ২০৪০ সালের মধ্যে উৎপাদন ৪০ লাখ ব্যারেলে নেওয়ার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনাও ছিল দেশটির।

আল-সাবাহ বলেন, হরমুজ প্রণালি খুলে গেলে অবাধ চলাচল ফিরবে এবং কুয়েত সহজেই যুদ্ধের আগের উৎপাদনমাত্রায় ফিরতে পারবে, এমনকি তার চেয়েও বেশি উৎপাদন সম্ভব হবে।

তবে বর্তমানে প্রতিদিন কতটা তেল সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে, সে বিষয়ে কোনো পরিসংখ্যান দিতে রাজি হননি তিনি।

অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা

প্রাথমিক সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে কুয়েতের অর্থনীতি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ দশমিক ৬ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। একই সময়ে দেশটির তেল খাতের মোট দেশজ উৎপাদন কমেছে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ।

তবে প্রকৃত ক্ষতির মাত্রা আরও বেশি হতে পারে। কারণ প্রকাশিত অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের মধ্যে যুদ্ধের প্রথম মাসের তথ্যই মূলত প্রতিফলিত হয়েছে।

যুদ্ধের মধ্যেও কুয়েতিরা মোটামুটি দৃঢ় থাকার চেষ্টা করছেন। তবে ইরানের হামলা এবং ইরান-সমর্থিত সামরিক তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। রাতে দেশটির বড় বড় জ্বালানি স্থাপনা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পানি শোধনাগারের বেশির ভাগের আলো বন্ধ রাখা হচ্ছে।

তেল সংরক্ষণের বিশাল ট্যাংকগুলোও হামলা থেকে রক্ষায় অনেক জায়গায় নতুন করে কাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে।

ঐতিহাসিক আল-মুবারাকিয়া বাজারে নূরা নামে ৪৫ বছর বয়সী এক নারী এএফপিকে বলেন, ‘আমরা এর চেয়েও খারাপ পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছি। আমরা কুয়েত। প্রতিরোধ আমাদের রক্তে।’

তবে ব্যক্তিগত আলাপে অনেক কুয়েতি আরও খোলামেলাভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। কেউ কেউ মার্কিন বাহিনীর সমালোচনা করছেন, আবার কেউ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থানের সমালোচনা করছেন।

হরমুজের বিকল্প নেই

কেপিসির প্রধান নির্বাহী জানান, প্রতিষ্ঠানটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরে তেল সংরক্ষণের ট্যাংকও হরমুজ সংকটের ধাক্কা কিছুটা সামলাতে সহায়তা করছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কুয়েতের ভবিষ্যতের জন্য হরমুজ প্রণালির ভাগ্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

জ্বালানি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলারের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক প্রধান আমেনা বকর বলেন, হরমুজের ওপর কুয়েতের নির্ভরতা এখন দেশটির ‘কৌশলগত দুর্বলতায়’ পরিণত হয়েছে।

তাঁর মতে, যুদ্ধের আগে কুয়েতের তেল উৎপাদন স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরতে দুই থেকে তিন মাস সময় লাগতে পারে। বড় ধরনের সাময়িক ধাক্কা সামলানোর মতো আর্থিক সক্ষমতাও কুয়েতের রয়েছে।

তবে যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, নিরাপদ তেল রপ্তানি পথ না থাকার ঝুঁকিতে কুয়েতের অর্থনীতি তত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে সতর্ক করেন তিনি।

কেপিসির প্রধান নির্বাহী আল-সাবাহও স্পষ্ট করে দিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে অবাধ তেল ও গ্যাস পরিবহন এবং নৌ চলাচলের কোনো বিকল্প নেই।

তাঁর সতর্কবার্তা, হরমুজ দিয়ে জ্বালানি ও জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হলে খুব দ্রুত আরেকটি বড় জ্বালানি সংকট তৈরি হতে পারে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement