আদালতের আদেশও থামাতে পারেনি উচ্ছেদ, খোলা আকাশের নিচে পরিবার
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ধুলোমাখা মাটির ওপর পাতলা একটি গদি। তার ওপর কাত হয়ে শুয়ে আছেন আদেল দারাগমেহ। পায়ের এক পাশ থেকে স্যান্ডেলটি প্রায় খুলে গেছে। দুর্বল কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমরা ঘুমাতে পারছি না, ঠিকমতো পানিও খেতে পারছি না, খাওয়াও হচ্ছে না।’
তাঁর মাথার ওপর বাঁকানো কাঠের খুঁটির সঙ্গে বাঁধা কালো ত্রিপল ও পুরোনো কম্বল। দুপুরের দিকে তাপমাত্রা ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেলেও এটিই এখন আদেল, তাঁর স্ত্রী খেইরিয়েহ ও পরিবারের সদস্যদের একমাত্র আশ্রয়।
কয়েক দিন আগে ইসরায়েলি বুলডোজারে তাঁদের বাড়িটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। পরিবারের দাবি, বাড়িটি রক্ষায় ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্টের একটি আদেশ থাকা সত্ত্বেও এই উচ্ছেদ চালানো হয়। ফলে আবারও গৃহহীন হয়ে পড়েছে পরিবারটি।
আদেলের স্ত্রী খেইরিয়েহ পাশে একটি চেয়ারে বসে আছেন। দুই হাতে ধরে রেখেছেন ছোট একটি প্লাস্টিকের পানির কাপ।
ঢাল বেয়ে প্রায় ৩০ মিটার ওপরে বসতি স্থাপনকারীদের তৈরি একটি বেড়া এখন পাহাড়ের ঢাল কেটে গেছে। এর ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম যে জমিতে আদেল ও তাঁর ভাইদের পশুর পাল চরে বেড়িয়েছে, সেখান থেকে তাঁরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। পাহাড়ের চূড়ায় বেড়ার ওপারে উড়ছে ইসরায়েলের পতাকা।
‘আমরা যে অবস্থার মধ্যে আছি, এটা কি লজ্জার নয়?’-এক ঘণ্টার কথোপকথনে বারবার প্রশ্ন করেন আদেল।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে প্রতিদিন ওষুধ খান তিনি। কিন্তু গত কয়েক দিনে ওষুধ সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। আদেলের ভাষায়, ‘বাড়ির ভেতরের ওষুধও বুলডোজারে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। আমাদের জিনিসপত্র, ঘরের সবকিছু শেষ। ফোন, সৌর প্যানেল-সব ধ্বংস। বিদ্যুৎ নেই, পানি নেই।’
ইসরায়েলে অক্টোবরে অনুষ্ঠেয় তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের প্রস্তুতির মধ্যেই পশ্চিম তীরে বাড়িঘর উচ্ছেদের ঘটনা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দারাগমেহ পরিবার বলছে, এমনকি ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্টের নিষেধাজ্ঞাও এখন বুলডোজার থামাতে পারছে না।
‘পুরো এলাকা খালি করতে পাঁচ মিনিট’
দারাগমেহ পরিবারের বাড়ির ধ্বংসাবশেষ এখনও ছড়িয়ে আছে। সেখানে পড়ে আছে কাপড়চোপড়, গুঁড়িয়ে যাওয়া ওষুধের বাক্স, দরজা খুলে থাকা একটি ছোট ফ্রিজ এবং ভেঙে যাওয়া কংক্রিটের ব্লক।
এর কিছুদিন আগেই আদেলের ছেলে হিলালের বাড়িও কোনো আগাম সতর্কতা ছাড়াই গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এরপর গত ২৮ জুলাই আদেল ও খেইরিয়েহর বাড়ি ধ্বংসের ঘটনাটি তাঁদের কাছে আরও বড় ধাক্কা হয়ে আসে।
সেদিন আদেল ওষুধ আনতে কাছের তুবাসে গিয়েছিলেন। বাড়িতে ছিলেন খেইরিয়েহ ও তাঁদের মেয়ে হানা। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, ইসরায়েলি সেনা, বসতি স্থাপনকারী ও সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের কর্মকর্তারা একটি বুলডোজারসহ প্রায় ১০টি গাড়ি নিয়ে সেখানে আসে।
‘আমি তখন ঘুমাচ্ছিলাম। তারা ঘুমের মধ্যেই আসে,’ বলেন খেইরিয়েহ।
তিনি পরিবারের আইনি নথিপত্র নিয়ে বাইরে আসেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, আগের একটি ইসরায়েলি সুপ্রিম কোর্টের আদেশের কারণে বাড়িটি উচ্ছেদ থেকে সুরক্ষিত।
পরিবারটির করা মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ২০২২ সালের একটি উচ্ছেদ আদেশ স্থগিত রেখেছিল আদালত।
সেনারা কাগজপত্র নেয়, পড়ে এবং নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে। এরপর সেগুলো খেইরিয়েহর হাতে ফিরিয়ে দেয়।
তারপরও বুলডোজার চালু করা হয়।
খেইরিয়েহর ভাষ্য অনুযায়ী, এক কর্মকর্তা তাঁকে বলেন, ‘পুরো এলাকা খালি করতে পাঁচ মিনিট।’
তিনি জবাব দেন, ‘আমি পারব না। আমি একা, আমি অসুস্থ।’
অসুস্থ অবস্থায় নিজের বাড়ির দিকে এগিয়ে আসা বুলডোজার দেখে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তিন ঘণ্টা পর অ্যাম্বুলেন্সে তাঁর জ্ঞান ফেরে।
‘আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই বুলডোজার চলতে শুরু করে। পুরো বাড়ি-সবকিছু। আমাদের সব জিনিসপত্র-সব শেষ,’ বলেন তিনি।
মাটিতে শুয়ে থাকা আদেল দুর্বল কণ্ঠে বলেন, ‘কোনো আদেশ নেই, কোনো আইন নেই। মানবতাও নেই।’
‘বৈষম্যমূলক’ ব্যবস্থা
পরিবারটির আইনজীবী তাওফিক জাবারিন বলেন, আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও সেনাবাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীরা বাড়ি ধ্বংস করেছে। তাঁর দাবি, হিলালের বাড়ি ধ্বংসের পর প্রসিকিউশন ঘটনাটিকে সেনাবাহিনীর ‘ভুল’ বলে দাবি করেছিল এবং এমন ঘটনা আর ঘটবে না বলেছিল। কিন্তু এরপরও একই ঘটনা ঘটেছে।
জাবারিনের অভিযোগ, বসতি স্থাপনকারীরা আইন ও আদালতের রায়কে গুরুত্ব দেয় না। তাঁদের বিশ্বাস, মাটিতে বাস্তবতা তৈরি করে ফেলাই আইন বা আদালতের আদেশের চেয়ে শক্তিশালী।
দারাগমেহ পরিবারটি পশুপালন করে। উত্তর জর্ডান উপত্যকার আইন আল-হিলওয়া ঝরনার পাশে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাদের বসবাস। চার ভাই ও তাঁদের পরিবার সেখানে থাকেন।
‘আমি এখানে জন্মেছি। আমার বাবা এখানে জন্মেছেন,’ বলেন আদেল।
কাছেই রয়েছে অবৈধ ইসরায়েলি বসতি মাসকিয়ট এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গড়ে ওঠা কয়েকটি বসতি স্থাপনকারীদের আউটপোস্ট। পরিবারের অভিযোগ, এসব স্থাপনার আশপাশে তাদের ওপর হামলা, চুরি ও অভিযান চালানোর ঘটনা ঘটেছে।
পশ্চিম তীরের ‘এরিয়া সি’-তে থাকা অন্যান্য পশুপালনকারী ফিলিস্তিনি পরিবারের মতো দারাগমেহ পরিবারকেও বছরের পর বছর বাড়ি ভাঙার আদেশের মুখোমুখি হতে হয়েছে। এই অঞ্চলটি ইসরায়েলের পূর্ণ সামরিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে।
দারাগমেহ পরিবার বলছে, এখন পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। আগে সতর্কবার্তা, এরপর উচ্ছেদ আদেশ এবং আপিলের সুযোগ-এই প্রক্রিয়া অন্তত ছিল। কিন্তু হিলাল ও আদেলের বাড়ি ভাঙার সময় কোনো উচ্ছেদ আদেশই দেখানো হয়নি। তাও আবার আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা অবস্থায়।
ধ্বংসের সময় সেনা, বসতি স্থাপনকারী ও সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের কর্মকর্তারা একসঙ্গে উপস্থিত ছিলেন বলে পরিবার ও সেখানে থাকা অধিকারকর্মীরা জানিয়েছেন।
পশ্চিম তীর সুরক্ষা কনসোর্টিয়ামের প্রধান অ্যালেগ্রা পাচেকো বলেন, এমন অনিয়মিত উচ্ছেদ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। তাঁর মতে, ফিলিস্তিনিদের জন্য আইনি সুরক্ষার যে সামান্য সুযোগ ছিল, সেটিও ক্রমেই ক্ষয়ে যাচ্ছে।
তাঁর ভাষায়, বিদ্যমান পরিকল্পনা ও জোনিং ব্যবস্থাই ফিলিস্তিনিদের জন্য বৈষম্যমূলক। ‘এরিয়া সি’-র অধিকাংশ ফিলিস্তিনি এলাকায় অনুমোদিত নির্মাণ পরিকল্পনা নেই। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ হিসেবে বিবেচিত ইসরায়েলি বসতিগুলো পরিকল্পিতভাবে জোনিং ও নির্মাণের সুযোগ পাচ্ছে।
জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় দপ্তর (ওসিএইচএ) জানিয়েছে, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ৬ হাজার ২০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৩ হাজারের বেশি শিশু। শুধু ২০২৬ সালের শুরু থেকে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ২ হাজার ৩০০-এর বেশি মানুষ।
এ বছর এখন পর্যন্ত পশ্চিম তীরে ৯০৭টির বেশি ফিলিস্তিনি স্থাপনা ধ্বংস করা হয়েছে।
আল-জাজিরা এসব ঘটনার বিষয়ে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ও সেনাবাহিনীর মন্তব্য চেয়েছে। প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
‘এখন তাদের থামানোর কিছুই নেই’
ধ্বংসস্তূপ থেকে কিছুটা দূরে একটি গাছের ছায়ায় বসে ছিলেন হিলাল। পাশে সেই ঝরনা, যা বহু প্রজন্ম ধরে তাঁর পরিবারের জীবন-জীবিকার অংশ। এখন সেখানে তাঁর কিংবা তাঁর পশুর প্রবেশও বন্ধ।
কিছুক্ষণ আগেই তিনি দেখেছেন, দুই ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী ঝরনার পানিতে শরীর ঠান্ডা করছে। তাঁদের একজন তীরে দাঁড়িয়ে সামরিক পোশাক পরছিলেন।
হিলালের অবশিষ্ট গবাদিপশুগুলোর বেশির ভাগই চুরি, জব্দ অথবা বিক্রি হয়ে গেছে বলে পরিবারের দাবি। এখন বসতি স্থাপনকারীরা চলে যাওয়ার পর ঝরনার যে সামান্য পানি পড়ে থাকে, সেখান থেকেই পশুগুলো পানি খুঁজে নেয়।
‘আমরা এই ঝরনার পানি পান করতাম। গাধার পিঠে করে পানি নিয়ে যেতাম। কিন্তু তারা আমাদের থামিয়ে দিয়েছে। বসতি স্থাপনকারীরা জায়গাটি বেড়া দিয়ে ঘিরে ফেলেছে,’ বলেন হিলাল।
পরে গাধায় চড়ে নিজের বাড়ির ধ্বংসাবশেষের কাছে যান তিনি। যেখানে একসময় দেয়াল ও ছাদ ছিল, সেখানে এখন পোড়া ধ্বংসস্তূপ। বুলডোজারের চাপে বাঁকানো ও জট পাকানো ধাতব পাইপ পড়ে আছে।
হিলাল গাধার ওপর বসেই দেখিয়ে দেন, কোন জায়গায় ছিল কোন ঘর। তাঁর হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ ১ লাখ ৭০ হাজার শেকেল, যা প্রায় ৫৭ হাজার ডলারের সমান।
‘একটিও জিনিস সঙ্গে নিয়ে বের হতে পারিনি। সবকিছু শেষ,’ বলেন তিনি।
পাশের বাড়িটি আদেলের ভাই কাদরির। গত বছরের আগস্টে সেটিও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেখানে থাকা কয়েকজন স্বজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পুরো পরিবার এখন আতঙ্কে আছে-কখন পরের বাড়িতে বুলডোজার আসে।
পরিবারের এক সদস্য বলেন, ‘এখন তাদের থামানোর মতো কিছুই নেই। তাদের আর কোনো আদেশও লাগে না। আমরা ভয় পাচ্ছি, পরেরবার আমাদের পালা।’
কাছের বসতি স্থাপনকারী ও সেনাদের বাধার কারণে আদেল ও খেইরিয়েহ নতুন করে বাড়ি বানাতেও পারছেন না। প্রয়োজনীয় সামগ্রীর জন্য তাঁদের এখন স্বজনদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
পরিবারের এক সদস্য বলেন, সবাই একে অপরকে সাহায্য করছে। কিন্তু যখন নিজেদেরই যথেষ্ট নেই এবং পরের আঘাত কার ওপর আসবে জানা নেই, তখন পরিস্থিতি সামলানো কঠিন।
পরিবারটির দাবি, এর আগে বসতি স্থাপনকারীদের চুরি এবং কর্তৃপক্ষের জব্দের ঘটনার পর এবার আরও ৫০টি গবাদিপশু বসতি স্থাপনকারীরা নিয়ে গেছে।
শারীরিকভাবে দুর্বল ও প্রচণ্ড গরমে ক্লান্ত আদেল মাটিতে শুয়ে ছিলেন। তবে অতীতের বিয়ের অনুষ্ঠানগুলোর কথা উঠতেই তাঁর কণ্ঠে কিছুটা প্রাণ ফিরে আসে। মুখে ফুটে ওঠে প্রশস্ত হাসি।
তিনি ধীরে ধীরে হাততালি দিয়ে বেদুইনদের উৎসবের ঐতিহ্যবাহী ‘দাহিয়েহ’ গান ও নৃত্যের ছন্দ তুলতে থাকেন।
‘কী সুন্দর সময় ছিল আমাদের একসঙ্গে,’ বলেন তিনি।কিছুক্ষণ পর যেন সেই স্মৃতিচারণও তাঁর শেষ শক্তিটুকু কেড়ে নেয়। ঘামে ভেজা গদিতে আবার শুয়ে পড়েন তিনি।
‘ইনশা আল্লাহ, সেই দিনগুলো আবার ফিরে আসবে,’ বলেন আদেল।
সূত্র: আলজাজিরা