নতুন মার্কিন রণতরী মধ্যপ্রাচ্যে, চাপে লিংকন

 প্রকাশ: ১৪ অগাস্ট ২০২৬, ১১:৫৬ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

নতুন মার্কিন রণতরী মধ্যপ্রাচ্যে, চাপে লিংকন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন থাকা মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনে মানসিক স্বাস্থ্য ও সরবরাহসংক্রান্ত সমস্যার খবরের মধ্যে নতুন একটি রণতরী ওই অঞ্চলের দিকে রওনা হয়েছে।

প্রশান্ত মহাসাগরভিত্তিক ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন গত সপ্তাহে ভিয়েতনামের দা নাং বন্দর ছেড়েছে। একটি ক্রুজার ও একটি ডেস্ট্রয়ারও এর সঙ্গে রয়েছে। মার্কিন নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন মালাক্কা প্রণালি পেরিয়ে ভারত মহাসাগরের দিকে এগোচ্ছে।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে মোতায়েন থাকা দুটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর একটি হিসেবে আব্রাহাম লিংকনের স্থলাভিষিক্ত হতে পারে ওয়াশিংটন।

এর ফলে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন কোনো বিমানবাহী রণতরী থাকবে না। চীনকে ওই অঞ্চলের প্রধান শক্তি হিসেবে দেখলেও ট্রাম্প প্রশাসন এখন বেইজিংকে যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্রদের ওপর আধিপত্য বিস্তার থেকে বিরত রাখার বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

২৬০ দিনের বেশি সমুদ্রে লিংকন

ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন গত ২১ নভেম্বর সান দিয়েগো থেকে যাত্রা করে। জানুয়ারিতে এটি মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছায়। এরপর ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ শুরু হলে রণতরীটি ওই অভিযানে যুক্ত হয়।

লিংকনের মোতায়েনকাল ইতিমধ্যে ২৬০ দিনের বেশি হয়েছে, যা মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য রেকর্ড। দীর্ঘ সময় ধরে টানা সমুদ্রে থাকার কারণে জাহাজটির নাবিকদের মানসিক চাপ এবং জাহাজ ও সরঞ্জামের ওপর বাড়তি চাপ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে প্রচলিত সরবরাহকেন্দ্রগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় লিংকনে খাদ্য, পরিচ্ছন্নতার সামগ্রী ও ডাক পৌঁছানোতেও ঘাটতি তৈরি হয়েছিল বলে নৌবাহিনী স্বীকার করেছে।

নৌবাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নেতৃত্ব প্রথমে খাবার, এরপর পরিচ্ছন্নতার সামগ্রী এবং সবশেষে ডাক সরবরাহকে অগ্রাধিকার দিয়েছিল। বর্তমানে জাহাজে পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যকর খাবার রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ

লিংকনের নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও উদ্বেগের খবর সামনে এসেছে। মার্কিন নৌবাহিনী জানিয়েছে, জাহাজটিতে আত্মহত্যার চিন্তা বা আত্মহত্যার চেষ্টার ঘটনা বেড়েছে—এমন কোনো প্রবণতা তারা দেখতে পায়নি। তবে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য দেয়নি তারা।

নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আগস্টের শুরুতে লিংকন থেকে এক নাবিক সমুদ্রে পড়ে যান। দ্রুত তাঁকে উদ্ধার করে জাহাজের চিকিৎসা বিভাগে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে জাহাজ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

ঘটনাটি আত্মহত্যার চেষ্টা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে কি না, তা জানাতে রাজি হননি ওই কর্মকর্তা।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক অভিযান পরিচালনাকারী ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড অবশ্য জাহাজটির পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত নেতিবাচক খবরের বিরোধিতা করেছে।

এক বিবৃতিতে কমান্ড বলেছে, ২৬০ দিনের বেশি সমুদ্রে অবস্থান, ১০ হাজার উড্ডয়ন এবং ১৫ লাখ পাউন্ড অস্ত্র ব্যবহারের পরও আব্রাহাম লিংকন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপের নাবিক ও মেরিনরা ‘দৃঢ় ও প্রস্তুত’ রয়েছেন।

তদন্তের দাবি ডেমোক্র্যাটদের

লিংকনে নাবিকদের পরিস্থিতি নিয়ে তদন্ত এবং বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা।

কানেকটিকাটের সিনেটর ও সিনেট আর্মড সার্ভিসেস কমিটির সদস্য রিচার্ড ব্লুমেনথাল নৌবাহিনীর নেতৃত্বের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে বেশ কয়েকটি প্রশ্নের জবাব চেয়েছেন।

তিনি বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযান এবং ভবিষ্যতে ওই অঞ্চলে দীর্ঘ সময় বড় মার্কিন নৌবাহিনী মোতায়েন রাখার সম্ভাবনার প্রেক্ষাপটে লিংকনের দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

অ্যারিজোনার সিনেটর ও সাবেক মেরিন রুবেন গ্যালেগো জানিয়েছেন, তিনি জাহাজটিতে সরকারি পর্যবেক্ষণ সফরে যাওয়ার জন্য দুই দলের সদস্যদের নিয়ে একটি প্রতিনিধিদল পাঠানোর চেষ্টা করছেন।

নাবিকদের সঙ্গে যেভাবে আচরণ করা হচ্ছে, তা ‘শুধু নিন্দনীয় নয়, বিপজ্জনকও’ বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ অবশ্য লিংকনে সমস্যা নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোকে ‘সম্পূর্ণ ভুলভাবে উপস্থাপিত’ বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেন, যত দ্রুত সম্ভব লিংকনের নাবিকদের দেশে ফিরিয়ে এনে তাদের বদলে নতুন নাবিক মোতায়েন করতে চান।

হরমুজে অবরোধ অব্যাহত

ইরানের সঙ্গে নতুন করে বড় ধরনের সংঘর্ষের তীব্রতা সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে কমলেও মার্কিন নৌবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ পুনর্বহাল করেছে।

হেগসেথ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এই অবরোধ ‘অনির্দিষ্টকাল’ চালিয়ে যেতে পারে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ কীভাবে শেষ করতে চায়, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা প্রকাশ করেনি।

দীর্ঘ সময়ের মোতায়েন নিয়ে উদ্বেগ অবশ্য লিংকনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডও মে মাসের মাঝামাঝি ১১ মাসের মোতায়েন শেষে দেশে ফেরে, যা ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর মার্কিন নৌবাহিনীর সবচেয়ে দীর্ঘ মোতায়েনগুলোর একটি।

ফোর্ডের ওই অভিযানের সময় একটি লন্ড্রি কক্ষে আগুন লাগায় মেরামতের জন্য রণতরীটিকে ভূমধ্যসাগরে ফিরে যেতে হয়েছিল। এতে কয়েক শ নাবিকের ঘুমানোর জায়গা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

ইরান যুদ্ধের আগেও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ-দায়িত্ব ও অতিরিক্ত সময় জাহাজ ও নাবিকদের মোতায়েন নিয়ে উদ্বেগ ছিল। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে অভিযানে অংশ নেওয়া কয়েকটি মার্কিন নৌযানে একাধিক দুর্ঘটনাও ঘটেছিল। ইউএসএস হ্যারি এস ট্রুম্যানও প্রত্যাশার চেয়ে দীর্ঘ সময় মোতায়েনে থাকার কারণে একই ধরনের চাপের মুখে পড়েছিল।

Advertisement
Advertisement
Advertisement