পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি বাড়িতে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের অবরোধ

 প্রকাশ: ১৪ অগাস্ট ২০২৬, ১২:১৩ অপরাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি বাড়িতে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের অবরোধ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

অধিকৃত পশ্চিম তীরের কুসরা গ্রামে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ঘিরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের দিনের পর দিন চলা অবরোধের নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর ও ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

বৃহস্পতিবার দেওয়া পৃথক বিবৃতিতে দুই পক্ষই ঘটনাটিকে গুরুতর ও অমানবিক হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। পশ্চিম কুসরার রাস আল-আইন এলাকায় তিনটি ফিলিস্তিনি পরিবারকে ঘিরে পঞ্চম রাতেও অবরোধ চালিয়ে যাচ্ছিল কয়েক ডজন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর বলেছে, ইসরায়েলের সমর্থন বা নীরব সম্মতিতে বসতি স্থাপনকারীদের এসব ‘অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড’ পরিবারগুলোর জীবন অসহনীয় করে তুলছে। তাদের বাড়ি ও জমি ছাড়তে বাধ্য করাই এসব কর্মকাণ্ডের স্পষ্ট লক্ষ্য বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

জাতিসংঘের হিসাবে, তিনটি পরিবারের সদস্যসংখ্যা ১৫ জন। তাঁদের মধ্যে দুটি শিশু রয়েছে। রোববার থেকে পরিবারগুলো নিজেদের বাড়িতে কার্যত অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। তাদের পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে।

জাতিসংঘ সতর্ক করেছে, পরিবারগুলোকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার আগে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে।

ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বসতি স্থাপনকারীদের কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের ভাষায়, এগুলো ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ছাড়া অন্য কোনোভাবে বর্ণনা করা যায় না’।

মন্ত্রণালয় আরও অভিযোগ করেছে, অধিকৃত পশ্চিম তীর থেকে ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ ও অঞ্চলটি দখলে নেওয়ার নীতি বাস্তবায়নে ইসরায়েল বসতি স্থাপনকারীদের ‘নিয়ন্ত্রণহীন হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করছে।

এর আগে বৃহস্পতিবার ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবিও বসতি স্থাপনকারীদের কর্মকাণ্ডকে ‘সন্ত্রাস’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

‘সবই লোক দেখানো’

বৃহস্পতিবার ঘটনাস্থল থেকে আল-জাজিরার প্রতিবেদক নিদা ইব্রাহিম জানান, ইসরায়েলি সেনারা প্রথমে অবরুদ্ধ পরিবারগুলোকে নিজেদের বাড়ি থেকে বের করে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। বাইরে তখন বসতি স্থাপনকারীরা অবস্থান করছিল।

পরিবারগুলো বের হতে অস্বীকৃতি জানায়। তাদের আশঙ্কা ছিল, একবার বাড়ি ছাড়লে ইসরায়েলি সেনারা আর তাদের ফিরতে দেবে না। পরে তিনটি পরিবারকে একটি বাড়িতে একত্র করা হয়।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, অতীতেও বসতি স্থাপনকারীরা পরিবারগুলোকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে পরে সেসব সম্পত্তি দখলে নিয়েছে।

কুসরায় কয়েক দশক ধরেই বসতি স্থাপনকারীদের হামলার ঘটনা ঘটছে। ইব্রাহিমের প্রতিবেদনে বলা হয়, অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ এবং হামলাকারীদের জবাবদিহির আওতায় না আনার কারণে সহিংসতা বাড়ছে বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

বৃহস্পতিবার ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, কুসরা ও কাছের একটি গ্রামে দুটি ‘অবৈধ আউটপোস্ট’ সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং একজন ইসরায়েলিকে আটক করা হয়েছে। পাশাপাশি আরও সেনা পাঠিয়ে ‘প্রতিরক্ষামূলক অভিযান ও টহল’ চালানো হচ্ছে বলেও জানানো হয়।

তবে ইব্রাহিমের ভাষ্য, অধিকাংশ ফিলিস্তিনি মনে করেন, ক্যামেরার সামনে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর এই তৎপরতা মূলত লোক দেখানো। তাঁদের আশঙ্কা, শেষ পর্যন্ত বসতি স্থাপনকারীরা আবার ফিরে আসবে।

কুসরার মেয়র আবদেল আজিম ওয়াদি আল-জাজিরাকে বলেন, ইসরায়েলি সেনারা বসতি স্থাপনকারীদের সুরক্ষা ও সহায়তা করছে।

‘আমরা তাদের একসঙ্গে নামাজ পড়তে, বারবিকিউ করতে এবং নাচতে দেখেছি,’ বলেন তিনি। তাঁর দাবি, অবরুদ্ধ পরিবারগুলোকে রক্ষা করার বিষয়ে সেনাদের তেমন আগ্রহ নেই।

কুসরার বাসিন্দা আবদুল করিম হাসান বলেন, নিজের বাড়ি রক্ষার জন্য তিনি সাত মাস ধরে গাড়িতে ঘুমাচ্ছেন।

তাঁর ভাষায়, ‘সবই লোক দেখানো। তারা যদি সত্যিই ব্যবস্থা নিতে চাইত, পুরো অভিযান শেষ করতে এক ঘণ্টাও লাগত না। সেখানে মাত্র ২০ জন বসতি স্থাপনকারী। ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে যেভাবে আচরণ করা হয়, তাদের সঙ্গেও সেভাবে আচরণ করলে এক ঘণ্টারও কম সময়ে সব শেষ করা সম্ভব।’

পশ্চিম তীরজুড়ে সহিংসতা অব্যাহত

অধিকৃত পশ্চিম তীরের অন্য এলাকাতেও বৃহস্পতিবার ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী ও সেনাদের সহিংসতা অব্যাহত ছিল বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনের সরকারি বার্তা সংস্থা ওয়াফা।

কাফর সুর ও জালাজোন শরণার্থীশিবিরে ফিলিস্তিনি বাড়িঘর এবং আল-জিফতলিক এলাকায় কৃষকদের আশ্রয়স্থল ধ্বংসের নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

কালকিলিয়ায় ২০২৪ সালের এক হামলায় নিহত এক ফিলিস্তিনি যোদ্ধার সাত স্বজনকে আটক করেছে ইসরায়েলি সেনারা। রামাল্লার পূর্বে বুরকা এলাকায় বসতি স্থাপনকারীদের অনুপ্রবেশের সময় আরও তিন ফিলিস্তিনিকে আটক করা হয়েছে।

পশ্চিম তীরের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে বসতি স্থাপনকারীদের হামলার ঘটনাও ঘটেছে। এর মধ্যে একটি ঘটনায় একটি শিশুসহ তিন ফিলিস্তিনিকে গাড়ির ভেতর মরিচের গুঁড়ার স্প্রে ছোড়া হয়।

এদিকে, জেনিনের কাছে একটি বসতি স্থাপনকারী গোষ্ঠী আবারও একটি বসতি স্থাপন করেছে। তুলকারেমের কাছের একটি শহরের মালিকানাধীন জমিতেও নতুন একটি বসতি স্থাপনকারীদের আউটপোস্ট গড়ে তোলা হয়েছে।

সূত্র: আলজাজিরা

Advertisement
Advertisement
Advertisement