স্কুল থেকেই পলিথিনবিরোধী আন্দোলনে শিশুদের নেতৃত্ব দিতে হবে: পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী
খুলনা ব্যুরো
পরিবেশ রক্ষায় শিশুদের সচেতনতা ও নেতৃত্বকে কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, স্কুল থেকেই পলিথিন ও প্লাস্টিকবিরোধী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে প্লাস্টিক ও পলিথিনমুক্ত করার পাশাপাশি পরিবার ও সমাজে পরিবেশবান্ধব অভ্যাস গড়ে তুলতে শিশুদের সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) বিকেলে খুলনা নগরের সিএসএস আভা সেন্টারে ষষ্ঠ বার্ষিক উপকূলীয় শিশু জলবায়ু সম্মেলনের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। জাগ্রত যুব সংঘ (জেজেএস) ও উপকূলীয় শিশু ফোরাম যৌথভাবে দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলনের আয়োজন করে।
পরিবেশ রক্ষায় অভ্যাস পরিবর্তনের তাগিদ
শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, দেশের পরিবেশ দূষণ এখন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। শুধু সভা-সমাবেশ, বক্তব্য বা প্রকল্প গ্রহণের মধ্যে পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; ব্যক্তিগত জীবনেও এর প্রতিফলন ঘটাতে হবে।
তিনি বাজারে যাওয়ার সময় পলিথিনের পরিবর্তে কাপড় ও পাটের ব্যাগ ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তোলার আহ্বান জানান। সুন্দরবনে প্লাস্টিকের বোতল নিয়ে প্রবেশ বন্ধের প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, পরিবেশ রক্ষার অঙ্গীকার তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা দৈনন্দিন আচরণে বাস্তবায়িত হবে।
উপকূলে নিরাপদ পানির সংকট মোকাবিলায় গুরুত্ব
উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানির সংকট প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, একসময় গ্রামের পুকুরের পানি মানুষ ব্যবহার করত। কিন্তু দূষণ ও রোগজীবাণুর কারণে বর্তমানে পুকুরের পানি ব্যবহারে ঝুঁকি বেড়েছে। তাই পুকুরগুলোকে নিরাপদ পানির উৎস হিসেবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থাও সম্প্রসারণ করা জরুরি।
অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ
দেশের ইটভাটাগুলোর দূষণ প্রসঙ্গে শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, দেশে প্রায় সাড়ে সাত হাজার ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৭০০টি বৈধ এবং বাকিগুলো অবৈধ। ইটভাটাগুলো পর্যালোচনা করে কোনগুলো বৈধতার যোগ্য, কোনগুলো সংশোধনের সুযোগ পাবে এবং কোনগুলো বন্ধ করতে হবে, তা নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ইটভাটার দূষণে বায়ুর মান নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি কৃষিজমির উর্বর মাটিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই ধাপে ধাপে পোড়ানো ইটের ব্যবহার কমিয়ে নির্মাণকাজে ব্লকের ব্যবহার বাড়াতে হবে। স্থানীয় সরকার প্রকল্পে অপ্রয়োজনে পোড়ানো ইট ব্যবহার করা হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর উদ্যোগ
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় সৌর ও বায়ুশক্তির ব্যবহার, বায়োগ্যাস উৎপাদন, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বৃক্ষরোপণ এবং খাল পুনঃখনালের মতো কার্যক্রম বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী।
তিনি জানান, আগামী পাঁচ বছরে দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শিশুদের নেতৃত্বেই গড়ে উঠতে পারে পরিবেশ আন্দোলন
সম্মেলনে শিশুদের পরিবেশবান্ধব চিন্তা ও উদ্ভাবনী প্রকল্পের প্রশংসা করে শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, পুরস্কার অর্জনই বড় বিষয় নয়; সম্মেলন থেকে পাওয়া জ্ঞান ও ধারণা পরিবার এবং উপকূলীয় সমাজে বাস্তবায়ন করাই প্রকৃত সাফল্য।
তিনি বলেন, শিশুদের নেতৃত্বে পরিবেশ রক্ষার সামাজিক আন্দোলন আরও শক্তিশালী হতে পারে। এ জন্য তাদের উদ্যোগকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি বাস্তব কাজের সুযোগ দিতে হবে।
সম্মেলনে শিশুদের বিভিন্ন দাবি
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন খুলনার অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) সিফাত মেহনাজ, প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের (পিআইবি) মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ, খুলনার জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত, কনসার্ন বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর মনীশ কুমার আগরওয়াল এবং নারায়ণগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. নজমুস সাদাত।
সম্মেলনের সমাপনী বক্তব্য দেন জেজেএসের নির্বাহী পরিচালক ও সম্মেলন সমন্বয়ক এ টি এম জাকির হোসাইন। পরে শিশু ফোরামের নূর আহমাদ জিদান ও নওশিন ইসলামের ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মধ্য দিয়ে সম্মেলনের সমাপ্তি হয়।
সমাপনী পর্বে উপকূলীয় শিশুরা জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি থেকে সুরক্ষা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে শিশুদের অংশগ্রহণ এবং জলবায়ু কার্যক্রমের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার দাবি জানায়। শিশুদের পক্ষে বক্তব্য দেন রোজ বৈরাগী, মুন মন্ডল, দিশা মজুমদার, মনিরা সুলতানা রূপা ও আয়শা আক্তার মেঘলা।
সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের বিভিন্ন অধিবেশনে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় শিশুদের জীবনসংগ্রাম, ক্ষয়ক্ষতি, জলবায়ু অর্থায়নে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর প্রবেশাধিকার এবং কপ-৩১ সম্মেলনে শিশুদের প্রত্যাশা নিয়ে আলোচনা হয়। এতে সরকারি দপ্তর, বিশ্ববিদ্যালয়, উন্নয়ন সংস্থা ও নাগরিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সম্মেলনে জানানো হয়, আগামী নভেম্বরে তুরস্কে অনুষ্ঠিতব্য কপ-৩১ সম্মেলনে খুলনা শিশু ফোরামের নওশিন ইসলাম ও নূর আহমাদ জিদানের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
শিশু প্রতিনিধিরা বলেন, ‘আমরা শুধু ভবিষ্যৎ নই, আমরা উন্নয়নের অংশীদার। আমরা চাই, আমাদের কথা শোনা হোক এবং সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক। কপ সম্মেলনেও আমাদের দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।’