দহগ্রামে বিএসএফের খুঁটি বসানোর চেষ্টা: বিজিবির জোরালো বাধায় পিছু হটল ভারত, সীমান্তে টানটান উত্তেজনা

 প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬, ০৬:৩৫ পূর্বাহ্ন   |   রংপুর

দহগ্রামে বিএসএফের খুঁটি বসানোর চেষ্টা: বিজিবির জোরালো বাধায় পিছু হটল ভারত, সীমান্তে টানটান উত্তেজনা

লালমনিরহাট প্রতিনিধি:

​লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) দফায় দফায় খুঁটি ও কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের প্রচেষ্টা নসাৎ করে দিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। মাত্র চার দিনের ব্যবধানে দুইবার শূন্য লাইনের কাছাকাছি এসে ভারতের এমন একতরফা আগ্রাসী পদক্ষেপের কারণে ঐতিহাসিক তিনবিঘা করিডোর সংলগ্ন এই সীমান্ত এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। তবে বিজিবির অতন্দ্র প্রহরা ও তাত্ক্ষণিক জোরালো প্রতিবাদের মুখে শেষ পর্যন্ত নিজেদের কার্যক্রম গুটিয়ে পিছু হটতে বাধ্য হয় ভারতীয় বাহিনী। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও যেকোনো ধরনের উসকানি মোকাবিলায় সীমান্তে বাড়তি সতর্কতা জারি করেছে বিজিবি।

​সীমান্তের এই উত্তেজনার সূত্রপাত ঘটে গত ১৮ মে। ওই দিন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে দহগ্রাম বিওপির (বর্ডার আউটপোস্ট) দায়িত্বপূর্ণ এলাকা ডিএএমপি ৬/১৬-এস সীমান্ত পিলারের কাছে অতর্কিত তোড়জোড় শুরু করে বিএসএফের ১৭৪ ব্যাটালিয়নের তরুণ ক্যাম্পের সদস্যরা। আন্তর্জাতিক নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে শূন্য লাইন থেকে মাত্র ১০ থেকে ২০ গজ ভারতের অভ্যন্তরে তারা হুট করেই ১৫টি বাঁশের খুঁটি পোতার চেষ্টা চালায়। সাধারণত নো-ম্যান্স ল্যান্ডের এত কাছাকাছি কোনো ধরনের স্থায়ী বা অস্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করতে গেলে উভয় দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পূর্বানুমতি ও যৌথ জরিপের প্রয়োজন হয়। কিন্তু বিএসএফ সেই নিয়ম অগ্রাহ্য করায় তৎকালীন কর্তব্যরত বিজিবি সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে তীব্র বাধা দেন। বিজিবির অনড় অবস্থানের মুখে সে যাত্রায় স্থান ত্যাগ করতে বাধ্য হয় বিএসএফ।

​ঐতিহাসিক পটভূমি: ছিটমহল বিনিময়ের পর থেকে দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের সাথে যুক্ত হলেও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই অঞ্চলটি বরাবরই ভূ-রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল। তিনবিঘা করিডোরের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা বাংলাদেশের জন্য সবসময়ই একটি মর্যাদার লড়াই।

​এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই গত ২২ মে বৃহস্পতিবার একই সীমান্তের ডিএএমপি ৭/৩০-এস পিলারের কাছে পুনরায় একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী। এবার তারা আরও সুসংগঠিত হয়ে খুঁটি স্থাপনের চেষ্টা চালালে সীমান্তের পরিস্থিতি দ্রুত ঘোলাটে হয়ে ওঠে। খবর পাওয়া মাত্রই বিজিবির একটি বিশেষ টহল দল ঘটনাস্থলে ছুটে যায় এবং ভারতের এই উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তীব্র ও জোরালো প্রতিবাদ জানায়। একপর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে তীব্র বাক্যবিনিময় হয় এবং বিএসএফ তাদের নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়।

​কাজ বন্ধ হলেও অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে সীমান্তের রণকৌশলগত অবস্থানে পরিবর্তন আনে বিএসএফ। ভারতের অভ্যন্তরে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন সশস্ত্র বিএসএফ সদস্য এসে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান তথা ‘ডিফেন্সিভ পজিশন’ নেয়। বিএসএফের এমন মারমুখী ও যুদ্ধংদেহী মনোভাবের জবাবে বাংলাদেশ অংশেও তাৎক্ষণিকভাবে ৪ থেকে ৫ সেকশন সশস্ত্র বিজিবি সদস্য ভারী অস্ত্রসহ পাল্টা প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান গ্রহণ করে। মুখোমুখি এই অবস্থানের কারণে দুই দেশের সীমান্তজুড়ে এক চরম যুদ্ধাবস্থা এবং টানটান উত্তেজনা তৈরি হয়, যা সীমান্ত সংলগ্ন সাধারণ গ্রামবাসীদের মনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করে।

​পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করার আগেই তা নিয়ন্ত্রণে আনতে দ্রুত কূটনৈতিক ও কৌশলগত উদ্যোগ নেয় বিজিবি। রক্তক্ষয়ী সংঘাত এড়াতে বিজিবি ও বিএসএফের ব্যাটালিয়ন কমান্ডার পর্যায়ে জরুরি ভিত্তিতে টেলিকমিউনিকেশনের মাধ্যমে যোগাযোগ স্থাপন করা হয়। দীর্ঘ ফোনালাপে বিজিবির পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অবনতির বিষয়টি শক্তভাবে তুলে ধরা হয়। দীর্ঘ আলোচনার পর বিএসএফ তাদের ভুল স্বীকার করে সব ধরনের বিতর্কিত কার্যক্রম স্থগিত করার প্রতিশ্রুতি দেয় এবং ঘটনাস্থল থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেয়। বিএসএফ পিছু হটার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বিজিবি সদস্যরাও তাদের প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান থেকে ব্যারাকে ফিরে আসেন।

​পুরো বিষয়টি নিয়ে পাটগ্রাম সীমান্ত অঞ্চলের দায়িত্বে থাকা রংপুর ৫১ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজিউর রহমান গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, আপাতত সীমান্ত এলাকার পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে ও স্বাভাবিক রয়েছে। তবে ভারতের পক্ষ থেকে কেন বারবার এই ধরনের উসকানিমূলক আচরণের চেষ্টা করা হচ্ছে, তা বিস্তারিতভাবে খতিয়ে দেখতে এবং এর একটি স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধান নিশ্চিত করতে ব্যাটালিয়ন কমান্ডার পর্যায়ে একটি আনুষ্ঠানিক পতাকা বৈঠকের (ফ্ল্যাগ মিটিং) আহ্বান জানানো হয়েছে। সীমান্তের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বিজিবি দিনরাত ২৪ ঘণ্টা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলেও তিনি আশ্বস্ত করেন।

Advertisement
Advertisement
Advertisement