১৪ বছরেও শেষ হয়নি খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক প্রকল্প---- ৫ম বার ব্যয় ও মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব, ক্ষোভ নগরবাসীর
মাসুদ আল হাসান , খুলনা :
খুলনা শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্প ১৪ বছরেও শেষ হয়নি। একাধিকবার ব্যয় ও মেয়াদ বৃদ্ধির পর এবার পঞ্চমবারের মতো প্রকল্পটির ব্যয় ও সময় বাড়ানোর প্রস্তাব জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপনের প্রস্তুতি চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এ নিয়ে নগরবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
খুলনা শহরের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত ৩ দশমিক ৭৭ কিলোমিটার দীর্ঘ শিপইয়ার্ড সড়কটি নগরবাসীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগমাধ্যম। দীর্ঘদিন ধরে চলমান নির্মাণকাজের কারণে শুকনো মৌসুমে ধুলাবালি এবং বর্ষাকালে কাদামাটির ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে হাজারো মানুষকে।
খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ) সূত্রে জানা যায়, ২০১২ সালে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। পরে ২০১৩ সালের ৩০ জুলাই একনেক সভায় ৯৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৪ সালের ৩০ জুনের মধ্যে।
তবে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে ১২৬ কোটি ৫৮ লাখ টাকা করা হয় এবং মেয়াদ বাড়ানো হয় ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত। পরে তৃতীয় সংশোধনীতে ব্যয় বাড়িয়ে প্রায় ২৫৯ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়।
এ সময় প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের দাবি, ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবশালীদের সম্পৃক্ততা ছিল। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য আতাউর রহমান লিমিটেড ও মাহবুব ব্রাদার্স লিমিটেডকে যৌথভাবে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। কাজ চলাকালে ২০২৪ সালের ২১ মে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় চতুর্থবারের মতো প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়। একই সঙ্গে ব্যয় সামান্য কমিয়ে ২৫৪ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, মোট ২৫৪ কোটি টাকার মধ্যে ভূমি অধিগ্রহণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৯৯ কোটি টাকা। অবশিষ্ট ১৫৫ কোটি টাকা ভৌত নির্মাণকাজের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়।
এদিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাহবুব ব্রাদার্সের বিরুদ্ধে কাজের তুলনায় অতিরিক্ত বিল উত্তোলনের অভিযোগ ওঠে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ভৌত নির্মাণকাজের জন্য বরাদ্দ ১৫৫ কোটি টাকার মধ্যে প্রায় ৭০ কোটি ৩৬ লাখ টাকার বিল উত্তোলন করা হলেও প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি সেই অনুপাতে হয়নি।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রকল্পের কাজ ও অর্থ ব্যয়ের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। পরে কেডিএ কর্তৃপক্ষ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়, জরিমানা আরোপ করে এবং কার্যাদেশ বাতিল করে।
এদিকে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রকল্পটি নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে বলে জানা গেছে। দুদকের খুলনা কার্যালয় সরেজমিনে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে বিভিন্ন কাজের পরিমাপ গ্রহণ করে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কিছু ক্ষেত্রে কাজ সম্পন্ন না হলেও বিল পরিশোধের প্রমাণ পাওয়া গেছে। উদাহরণ হিসেবে সড়কের কার্পেটিং কাজ সম্পন্ন না হলেও সংশ্লিষ্ট বিল পরিশোধের তথ্য তদন্তে উঠে এসেছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
বর্তমানে প্রকল্পটি শেষ করতে নতুন করে সংশোধনী আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, অবশিষ্ট কাজ সম্পন্নের জন্য প্রকল্প ব্যয় আরও বাড়িয়ে প্রায় ২০০ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব প্রস্তুত করা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।
এ প্রসঙ্গে কেডিএ চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ হোসেন (পিএসসি) সাংবাদিকদের বলেন, “এ প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ের কোনো সুযোগ নেই। একটি প্রকল্প গ্রহণের সময় প্রাক্কলিত ব্যয়ের হিসাব করেই একনেকে উপস্থাপন করা হয়।”
প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যর্থতার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ যদি প্রকল্পটির কাজ সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে খুলনা সিটি করপোরেশন, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) অথবা সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রকল্পটি সম্পন্ন করা যেতে পারে।”
দীর্ঘ ১৪ বছরেও প্রকল্পটি শেষ না হওয়ায় খুলনাবাসীর প্রশ্ন—আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে শিপইয়ার্ড সড়কের দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেতে?