পাকিস্তানের কাছে সিরিজ হেরে বাংলাদেশে আসছে ক্ষতবিক্ষত অস্ট্রেলিয়া
ক্রীড়া ডেস্ক:
লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়ামের ঘূর্ণি পিচে তখন চারদিকের গ্যালারি জুড়ে উল্লাস। অন্যদিকে, মাথা নিচু করে মাঠ ছাড়ছেন অজি ক্রিকেটাররা। ফুটবল বিশ্বকাপের জমজমাট উন্মাদনার আবহেই যখন ক্রিকেটবিশ্বের চোখ বাংলাদেশের আসন্ন দ্বিপাক্ষিক সিরিজের দিকে, ঠিক তখনই পাকিস্তানের মাটিতে বড়সড় এক ধাক্কা খেলো অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট দল। তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজের শেষ ও নির্ণায়ক ম্যাচে স্বাগতিক পাকিস্তানের কাছে ৪ উইকেটে হেরে সিরিজ খোয়ালো তারা। ২-১ ব্যবধানে সিরিজ জিতে যখন শাহিন শাহ আফ্রিদির দল উৎসবে মাতোয়ারা, তখন বাংলাদেশে পা রাখার ঠিক আগে নিজেদের শক্তির ভিত নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া।
গাদ্দাফি স্টেডিয়ামের ঐতিহ্যবাহী স্পিন-সহায়ক উইকেটটি যে ব্যাটারদের জন্য চরম অগ্নিপরীক্ষা হতে যাচ্ছে, তা ম্যাচের শুরুতেই আঁচ করা গিয়েছিল। তবে নিয়মিত অধিনায়ক ও সিনিয়র ক্রিকেটারদের বিশ্রামের কারণে এই সফরে অজিদের নেতৃত্ব দেওয়া ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক জশ ইংলিস শুরুটা করেছিলেন দারুণভাবে। তাঁর ব্যাট ভর করেই এক পর্যায়ে ২ উইকেটে ৯৮ রান তুলে বেশ সুবিধাজনক অবস্থানেই ছিল অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু আধুনিক ক্রিকেটের অন্যতম সেরা পেসার শাহিন শাহ আফ্রিদির একটি বিধ্বংসী স্পেল এবং পাকিস্তানি স্পিনারদের যুগলবন্দি ম্যাচে অবিশ্বাস্য ধস নামায়। ৯৮ রানের মাথায় জশ ইংলিস ব্যক্তিগত ৬৫ রান করে সাজঘরে ফিরতেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে অজিদের ব্যাটিং লাইনআপ। পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের সামনে টিকতে না পেরে মাত্র ৪২ ওভারে ১৫৭ রানেই গুটিয়ে যায় ক্যাঙ্গারু বাহিনী। পাকিস্তানের মাটিতে ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে এটিই অস্ট্রেলিয়ার সর্বনিম্ন দলীয় স্কোর, যা বাংলাদেশের সফরের ঠিক আগে তাদের আত্মবিশ্বাসে বড়সড় এক চিড় ধরিয়েছে।
পাকিস্তানের হয়ে বল হাতে একাই ধস নামান ম্যাচ সেরা নির্বাচিত হওয়া শাহিন শাহ আফ্রিদি। ৩০ রান খরচায় ৩টি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট শিকার করে অজি মিডল অর্ডারকে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে দেননি তিনি। তাকে যোগ্য সংগত দিয়ে স্পিন জাদুতে অজিদের অল্প রানে বেঁধে রাখতে বড় ভূমিকা পালন করেন শাদাব খান ও আবরার আহমেদ, যারা দুজনেই শিকার করেন ২টি করে উইকেট।
১৫৮ রানের সহজ লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে পাকিস্তানের শুরুটাও অবশ্য খুব একটা মসৃণ ছিল না। দলীয় মাত্র ২৭ রানের মাথায় ওপেনার সাহিবজাদা ফারহানকে হারিয়ে শুরুতেই কিছুটা চাপে পড়ে স্বাগতিকরা। এরপর নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকায় ম্যাচটি লো-স্কোরিং থ্রিলারের রূপ নেয়। তবে সেই প্রাথমিক ধাক্কা সামাল দিতে ঢাল হয়ে দাঁড়ান দলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ব্যাটার বাবর আজম এবং সালমান আলি আগা। ওয়ানডে সুলভ ধীরস্থির ব্যাটিংয়ে ৩৩ রানের একটি কার্যকারী জুটি গড়ে তারা দলকে জয়ের পথে এগিয়ে নেন। অজিদের পক্ষে পাকিস্তানের এই জয়কে কঠিন করে তুলেছিলেন বাঁহাতি স্পিনার ম্যাথু কুনেমান। তিনি একাই বাবর ও সালমান দুজনকে ফিরিয়ে দিয়ে অজি শিবিরে আশার আলো জ্বালিয়েছিলেন। আউট হওয়ার আগে বাবর আজম খেলেন ৮৪ বলে ৪০ রানের এক ধৈর্যশীল ইনিংস।
বাবর ও সালমানের বিদায়ের পর পাকিস্তান এক পর্যায়ে ১১২ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে বেশ স্নায়ুচাপে পড়ে গিয়েছিল। জয়ের জন্য তখনো প্রয়োজন ছিল ৪৫ রান, হাতে মাত্র ৪ উইকেট। ম্যাচের এমন শ্বাসরুদ্ধকর মুহূর্তে ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন অভিজ্ঞ অলরাউন্ডার শাদাব খান ও তরুণ আব্দুল সামাদ। চাপের মুখে মাথা ঠান্ডা রেখে শাদাব খানের ২৯ রানের দায়িত্বশীল ইনিংস এবং আব্দুল সামাদের অপরাজিত ১৮ রানের ক্যামিওতে ভর করে শেষ পর্যন্ত কোনো বড় অঘটন ছাড়াই জয়ের বন্দরে পৌঁছে যায় পাকিস্তান। ম্যাচের ৪৯ বল হাতে রেখেই ৪ উইকেটের দাপুটে জয় নিশ্চিত করে মাঠ ছাড়ে তারা।
পাকিস্তানের মাটিতে এমন বিব্রতকর সিরিজ হারের ক্ষত নিয়ে এবার বাংলাদেশের বিমান ধরছে অস্ট্রেলিয়া। এদিকে মিরপুর ও চট্টগ্রামের স্পিন-বান্ধব উইকেটে ঘরের মাঠে বাংলাদেশ বরাবরই যেকোনো পরাশক্তির জন্য এক আতঙ্কের নাম। লাহোরের স্পিন ট্র্যাকে অজি ব্যাটারদের এমন অসহায় আত্মসমর্পণ নিশ্চিতভাবেই বাংলাদেশ শিবিরের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেবে কয়েক গুণ। ফুটবলের জোয়ারের মাঝেই ক্রিকেটপ্রেমীদের টানটান উত্তেজনা উপহার দিতে বাংলাদেশে পা রাখতে যাওয়া অস্ট্রেলিয়া এই হারের ধাক্কা সামলে কীভাবে ঘুরে দাঁড়ায়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।