সংবাদ শিরোনাম

পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রকল্পে ‘রেইমেনিং ওয়ার্কস’ নিয়ে বড় অনিয়মের অভিযোগ: কাজ শেষ হওয়ার আগেই বিল, মূল প্রকল্প ভেঙে ৬ টেন্ডারে প্রায় ২৭ কোটি টাকা ব্যয়ের অভিযোগ

 প্রকাশ: ০২ অগাস্ট ২০২৬, ১০:৪৫ পূর্বাহ্ন   |   রাজশাহী

পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রকল্পে ‘রেইমেনিং ওয়ার্কস’ নিয়ে বড় অনিয়মের অভিযোগ: কাজ শেষ হওয়ার আগেই বিল, মূল প্রকল্প ভেঙে ৬ টেন্ডারে প্রায় ২৭ কোটি টাকা ব্যয়ের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক:

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আবাসন প্রকল্পে আলোচিত ‘বালিশকাণ্ডের’ পর এবার পাবনা গণপূর্ত বিভাগের বিরুদ্ধে আরও বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পে মূল দরপত্রের কাজকে ‘অবশিষ্ট কাজ’ দেখিয়ে আলাদা করে একাধিক দরপত্র আহ্বান এবং কাজ বাস্তবে শেষ না হলেও বিল পরিশোধের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, হাসপাতাল নির্মাণের প্রায় ৩০০ কোটি টাকার মূল প্রকল্পের কাজ চলমান থাকা অবস্থায় ছয়টি পৃথক দরপত্রের মাধ্যমে প্রায় ২৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকার কাজ ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। এসব কাজের কয়েকটির বাস্তব অস্তিত্ব না থাকলেও ইতোমধ্যে বিল পরিশোধ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথি ও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১০ তলা ভবন নির্মাণে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার দরপত্র আহ্বান করা হয়। কাজটি পায় সাজিন কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। প্রকল্পের নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ২০২৭ সালে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা। তবে বর্তমানে ভবনটির মাত্র নবম তলার ছাদ ঢালাই সম্পন্ন হয়েছে।

এর মধ্যেই গত ২৮ জানুয়ারি হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পের বিভিন্ন কাজকে ‘রেইমেনিং ওয়ার্কস’ বা অবশিষ্ট কাজ দেখিয়ে ছয়টি পৃথক দরপত্র আহ্বান করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, বড় প্রকল্পকে ছোট ছোট প্যাকেজে ভাগ করে প্রতিটি দরপত্রের মূল্য পাঁচ কোটি টাকার নিচে রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের অনুমোদন এড়িয়ে স্থানীয়ভাবে কাজ ভাগ করে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।

পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা অনুযায়ী বড় কোনো প্রকল্পকে কৃত্রিমভাবে ছোট অংশে ভাগ করে দরপত্র আহ্বানের সুযোগ নেই বলেও অভিযোগকারীদের দাবি।

কাজ ছাড়াই প্রায় ৫ কোটি টাকার বিল

পাবনা গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর আহ্বান করা টেন্ডার আইডি-১২১৭৬৫০-এ হাসপাতালের ‘এ’ ব্লকের পাশের খোলা ছাদে কাচের কাঠামো নির্মাণের কথা উল্লেখ করা হয়। প্রায় ৪ কোটি ৯৬ লাখ ৮৮ হাজার ৯৫৫ টাকার এই কাজ পায় এসএ এন্টারপ্রাইজ।

প্রতিষ্ঠানটির মালিক দ্বীন ইসলাম। তিনি টুঙ্গিপাড়ার বাসিন্দা এবং আওয়ামী লীগ আমলে নগর গণপূর্ত ঠিকাদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন বলে জানা গেছে। এই কাজের বিলও পরিশোধ করা হয়েছে। তবে সরেজমিনে কাজটির দৃশ্যমান কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ।

দ্বীন ইসলাম জানিয়েছেন, তিনি শাহাদাত হোসেনকে তাঁর প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিলেন। তবে বর্তমানে কাজটির কী অবস্থা, সে বিষয়ে তিনি অবগত নন বলেও জানান।

একই কাজের নামে আরও দুই টেন্ডার

টেন্ডার আইডি-১২১৭৬১২-এর মাধ্যমে হাসপাতাল ভবনের জন্য অতিরিক্ত আরসিসি কাজ এবং ভিত্তির ইটের দেয়াল নির্মাণে ৪ কোটি ৯৮ লাখ ৯ হাজার ৭৯৪ টাকা ব্যয় ধরা হয়। কাজটি পায় মোখছেদুল আলম নয়নের মালিকানাধীন মেসার্স নূর কনস্ট্রাকশন। অভিযোগ রয়েছে, বাস্তবে কাজ না করেই এ প্রকল্পের বিল উত্তোলন করা হয়েছে।

একই প্রতিষ্ঠান আবার টেন্ডার আইডি-১২১৭৬২৭-এর মাধ্যমে ৪ কোটি ৯৮ লাখ ২০ হাজার ১৫৭ টাকার আরেকটি কাজ পায়। এতে হাসপাতাল ভবনের অতিরিক্ত ওভারহেড পানির ট্যাংক নির্মাণ ও শাটারিংয়ের অতিরিক্ত উচ্চতাসহ বিভিন্ন কাজের উল্লেখ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব কাজও মূল প্রকল্পের দরপত্রের অন্তর্ভুক্ত ছিল। শুধু দরপত্রের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেই বিল তুলে নেওয়া হয়েছে।

ভিনাইল ফ্লোরিং ও ইপোক্সি পেইন্টেও প্রশ্ন

টেন্ডার আইডি-১২১৭৬১৬-এ হাসপাতালের ল্যাবরেটরি, অপারেশন থিয়েটার ও আইসিইউতে ভিনাইল ফ্লোরিং এবং বিভিন্ন কক্ষে ইপোক্সি পেইন্ট সরবরাহ ও স্থাপনের কথা বলা হয়েছে। এর জন্য বরাদ্দ রাখা হয় ৪ কোটি ৯৭ লাখ ৮ হাজার ৭৬২ টাকা। কাজটি পায় মোহাম্মদ হারুন অর রশিদের মালিকানাধীন বন্ধু কনস্ট্রাকশন।

এ প্রতিষ্ঠানটি টেন্ডার আইডি-১২১৭৬২০-এর মাধ্যমে আরও ৪ কোটি ৯৭ লাখ ৮৫ হাজার ৬৬২ টাকার কাজ পায়। সেখানে হাসপাতাল ভবনের ১৫ ও ১২ ইঞ্চি ইটের দেয়াল নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এটিও প্রায় ৩০০ কোটি টাকার মূল দরপত্রের আওতাভুক্ত কাজ।

২ কোটি ৪৫ লাখ টাকায় বিশাল পরিসরের নির্মাণকাজ

আরেকটি টেন্ডার আইডি-১২১৭৫৯৬-এ আরসিসি দেয়াল, মার্বেল স্টোন ফ্লোরিং, ফেসিং স্ট্রিপ, মসজিদসংলগ্ন স্ল্যাব ও মসজিদ নির্মাণসহ টিচিং মর্গ, মর্চুয়ারি ভবন, গেট হাউস, নিরাপত্তা পোস্ট, বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন, পাবলিক টয়লেট, পাম্প হাউস ও জেনারেটর ভবন নির্মাণের কথা বলা হয়েছে।

এত বিস্তৃত কাজের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে মাত্র ২ কোটি ৪৫ লাখ ৬২ হাজার ১৫১ টাকা। সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, এতগুলো স্থাপনা এই অর্থে কীভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব, তা নিয়েও রয়েছে বড় ধরনের সংশয়।

কাজটি পেয়েছে পাবনার শালগাড়িয়ার মো. ইমামুর রহমানের মালিকানাধীন আইআর ইনফ্রাস্ট্রাকচার। নথি অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি ২০২৩ সালের ২২ জুন আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে প্রথম শ্রেণির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে তালিকাভুক্তির অনুমতি পায়।

মূল প্রকল্পের কাজই ‘অবশিষ্ট’ দেখানোর অভিযোগ

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ছয়টি টেন্ডারের অধিকাংশ কাজই হাসপাতালের মূল নির্মাণ প্রকল্পের আওতাভুক্ত। কিছু কাজ আবার ভবনের নির্দিষ্ট নির্মাণপর্ব শেষ হওয়ার পর করার কথা রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, মূল প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার আগেই এসব কাজ আলাদা করে ‘রেইমেনিং ওয়ার্কস’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়ায় বিতর্কিত সাজিন কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের কর্ণধার শাহাদাত হোসেনের প্রভাব ছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement