১২ ঘণ্টার অবরুদ্ধ রাজশাহী: জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপে শেষমেশ সচল চাকা

 প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬, ১২:৪১ অপরাহ্ন   |   রাজশাহী

১২ ঘণ্টার অবরুদ্ধ রাজশাহী: জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপে শেষমেশ সচল চাকা

প্রতিবেদক, রাজশাহী 

​রোববার রাতের এক রুদ্ধদ্বার বৈঠক থেকেই মূলত ঘটনার সূত্রপাত। জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের নতুন ২১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছিল বেশ ঢাকঢোল পিটিয়েই। শ্রমিক নেতা রফিকুল ইসলাম পাখিকে শীর্ষ পদে বসিয়ে নতুন যে কমিটি ঘোষণা করা হয়, তাতেই লুকিয়ে ছিল পরদিনের চরম বিশৃঙ্খলার বীজ। এই কমিটিকে পকেট কমিটি আখ্যা দিয়ে শ্রমিকদের একটি বড় অংশ ক্ষোভে ফেটে পড়ে। সেই ক্ষোভের অনল মাঠপর্যায়ে ছড়াতে খুব বেশি সময় নেয়নি। সোমবার ভোরের আলো ফোটার আগেই সাধারণ শ্রমিকরা রাজশাহীর কেন্দ্রস্থল থেকে শুরু করে বিভিন্ন উপজেলা ও দূরপাল্লার সব রুটের বাস চলাচল একযোগে বন্ধ করে দেয়। ফলে কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই এক নজিরবিহীন অচলাবস্থার মুখে পড়ে পুরো রাজশাহী বিভাগ।

​সকাল গড়াতেই শিরোইল বাস টার্মিনালসহ অন্যান্য কাউন্টারগুলোতে ভিড় করতে থাকেন হাজার হাজার সাধারণ যাত্রী। আচমকা এই ধর্মঘটের খবর জানা ছিল না কারও। তপ্ত রোদে ব্যাগ-লাগেজ হাতে নারী, শিশু এবং বয়োবৃদ্ধ যাত্রীদের ভোগান্তি রূপ নেয় চরম দুর্ভোগে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকাগামী চাকুরিজীবী ও জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনে বের হওয়া রোগীরা পড়েন চরম বিপাকে। বিকল্প হিসেবে ট্রেন বা ছোট যানবাহনের দিকে সাধারণ মানুষ ঝুঁকলেও, সেখানে ছিল উপচে পড়া ভিড় এবং অতিরিক্ত ভাড়ার নৈরাজ্য। মুহূর্তের মধ্যেই শ্রমিকদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল রূপ নেয় এক জনদুর্ভোগের মহাকাব্যে।

​পরিস্থিতি দিন দিন আরও ঘোলাটে হতে পারে—এমন আশঙ্কায় সকাল থেকেই তৎপর হয়ে ওঠে স্থানীয় প্রশাসন। রাজশাহীর জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম দিনভর দফায় দফায় বৈঠক করেন বাস মালিক সমিতি ও শ্রমিক নেতাদের বিবদমান পক্ষগুলোর সঙ্গে। তবে ক্ষমতার ভাগাভাগি আর প্রতিপত্তির লড়াই এতটাই তীব্র ছিল যে, সন্ধ্যা পর্যন্ত দফায় দফায় আলোচনা চললেও কোনো পক্ষই তাদের অবস্থান থেকে এক চুল নড়তে রাজি হয়নি। টেবিলে বসা আলোচনার যখন কোনো সুরাহা মিলছিল না, তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ভিন্ন কৌশল নেন স্বয়ং জেলা প্রশাসক।

​রাত যখন প্রায় সাড়ে ৯টা, তখন জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিয়ে সরাসরি হাজির হন উত্তপ্ত শিরোইল বাস টার্মিনালে। হাজারো বিক্ষুব্ধ শ্রমিকের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি তাদের ক্ষোভ ও দাবির কথা শোনেন। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট বার্তা দেন যে, শ্রমিকদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জন্য লাখ লাখ সাধারণ মানুষকে জিম্মি করা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। সংকট নিরসনে তিনি এক তাৎক্ষণিক ও দূরদর্শী ঘোষণা দেন। তিনি জানান, বাংলাদেশ শ্রমিক ফেডারেশন ঘোষিত জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের বিতর্কিত নতুন কমিটি পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত থাকবে।

​জেলা প্রশাসকের এই কড়া কিন্তু যৌক্তিক ঘোষণায় বরফ গলতে শুরু করে। স্থগিতাদেশের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা তাদের অবরোধ তুলে নেওয়ার ঘোষণা দেন। আর এর সঙ্গেই কেটে যায় দীর্ঘ ১২ ঘণ্টার এক দমবন্ধ করা অচলাবস্থা। কাউন্টারগুলোতে মুহূর্তের মধ্যে শুরু হয় টিকিট বিক্রির হাঁকডাক, অলস দাঁড়িয়ে থাকা বাসের ইঞ্জিনগুলো গর্জে ওঠে প্রাণচাঞ্চল্যে। গভীর রাতেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে নিজ নিজ গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হন অপেক্ষমাণ শত শত যাত্রী, আর চিরচেনা রূপে ফিরে আসে রাজশাহীর সড়ক যোগাযোগ।

Advertisement
Advertisement
Advertisement