কোরবানির পশুতে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ: সীমান্ত গলিয়ে গরু আসা ঠেকাতে 'জিরো টলারেন্স'

 প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬, ১০:৩১ পূর্বাহ্ন   |   রাজশাহী

কোরবানির পশুতে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ: সীমান্ত গলিয়ে গরু আসা ঠেকাতে 'জিরো টলারেন্স'

প্রতিবেদক, বগুড়া    

ডিজিটাল ঘড়িতে তখন সকাল ১০টা। সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর গ্রামের খামারি মফিজুল মিয়ার চোখেমুখে গত কয়েকদিন ধরেই চিন্তার ভাঁজ। গোয়ালঘরে পরম যত্নে বড় করা সাড়ে বারো মণ ওজনের কুচকুচে কালো ষাঁড় ‘কালা পাহাড়’-এর গায়ে হাত বুলাতে বুলাতে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলছিলেন। গো-খাদ্যের আকাশছোঁয়া দামের এই বাজারে নিজের সবটুকু সঞ্চয় আর হাড়ভাঙা খাটুনি ঢেলে দিয়েছেন এই পশুর পেছনে। কিন্তু পাড়ার চায়ের দোকানে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছিল এক ভীতি—সীমান্ত গলে যদি ওপার থেকে অবৈধ গরু ঢুকে পড়ে, তবে দেশি গরুর দাম পড়ে যাবে। মফিজুলের মতো লাখো খামারির কপাল পুড়বে, পুঁজি হারিয়ে পথে বসতে হবে।

মফিজুলদের এই নীরব হাহাকার আর উদ্বেগের মেঘ কাটাতে রবিবার এক নতুন আশার আলো জ্বলল বগুড়ার ‘মম ইন কনভেনশন সেন্টারে’। সেখানে বসেছিল প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্প (LDDP) আয়োজিত এক বিশেষ সেমিনার। আলোচনার মূল বিষয়বস্তু ছিল—‘টেকসই প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন, আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনা, বাজার সংযোগ ও ভ্যালু চেইন’।

সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু যখন পোডিয়ামে এসে দাঁড়ালেন, হলরুমে তখন পিনপতন নীরবতা। প্রতিমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে দেশের সীমান্ত পাহারা দেওয়া বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সহ সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনকে অত্যন্ত কঠোর ও স্পষ্ট ভাষায় একটি নির্দেশ জারি করলেন।

তিনি বুক ফুলিয়ে ঘোষণা দিলেন, দেশীয় খামারিদের স্বার্থ সুরক্ষায় এবং স্থানীয় উৎপাদন ব্যবস্থাকে টেকসই করতে সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে গবাদিপশু আনা ঠেকাতে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে। কোনো অবস্থাতেই দেশের সীমান্ত গলে বাইরের পশু ঢুকতে দেওয়া হবে না।

প্রতিমন্ত্রী হলের সবাইকে আশ্বস্ত করে দেশের এক অভাবনীয় সাফল্যের খতিয়ান তুলে ধরেন। তিনি বলেন:

"আমাদের দেশ আজ কোরবানির পশুতে সম্পূর্ণ আত্মনির্ভরশীল। দেশে বর্তমানে ১ কোটি ২৩ লাখের ওপর গবাদিপশু রয়েছে। আমাদের সম্ভাব্য চাহিদার তুলনায় প্রায় ২২ লাখ পশু উদ্বৃত্ত! যেখানে আমরা নিজেরাই স্বয়ংসম্পূর্ণ, সেখানে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে গবাদিপশু আমদানির বা চোরাই পথে আসার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।"

প্রতিমন্ত্রীর এই একটি ঘোষণায় যেন প্রাণ ফিরে পেলেন দেশের প্রান্তিক খামারিরা। তিনি খামারি ও ভোক্তাদের মাঝে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বাজার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন, যেখানে খামারিরা পাবেন পশুর ন্যায্য মূল্য আর সাধারণ ক্রেতারাও সহনীয় দামে কোরবানি দিতে পারবেন।

শুধু সীমান্ত বন্ধের রক্ষাকবচই নয়, প্রতিমন্ত্রী খামারিদের দেখালেন এক বিশাল সম্ভাবনার আকাশ। তিনি স্বপ্ন বুনে দিয়ে বলেন, এই উদ্বৃত্ত উৎপাদনকে কাজে লাগিয়ে আধুনিক খামার ব্যবস্থা, নিরাপদ উৎপাদন ও উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের মাধ্যমে খুব শীঘ্রই বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ খাতকে একটি লাভজনক রপ্তানিমুখী শিল্পে রূপান্তর করা হবে। সরকার খামারিদের উৎপাদন ব্যয় কমাতে এবং সহজে সরকারি সুবিধা পৌঁছে দিতে নিরলস কাজ করছে।

এই আশার বাণী ছড়ানোর পাশাপাশি এদিন বগুড়ায় আধুনিক জেলা কসাইখানা এবং জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের নবনির্মিত ভবনের শুভ উদ্বোধন করেন প্রতিমন্ত্রী।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজাহান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে খামারিদের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেন বগুড়া-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. রেজাউল করিম বাদশা এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন। অনুষ্ঠানজুড়ে আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনা ও নিরাপদ প্রাণিজ খাদ্য উৎপাদন নিয়ে এক ফলপ্রসূ আলোচনা হয়।

পরদিন সকালে জাতীয় দৈনিকের প্রথম পাতায় যখন এই খবরটি বড় বড় অক্ষরে ছাপা হলো, মফিজুল মিয়া তখন চায়ের দোকানে বসে পত্রিকাটা পড়ছিলেন। তাঁর মুখে তখন এক চিলতে চওড়া হাসি। সীমান্ত এখন সুরক্ষিত, খামারিদের ঘাম এখন আর সস্তায় বিক্রি হবে না—এই পরম স্বস্তি আর ভরসা নিয়ে মফিজুল আবার তাঁর ‘কালা পাহাড়’-এর পরিচর্যা করতে গোয়ালঘরের দিকে পা বাড়ালেন।

Advertisement
Advertisement
Advertisement