মরুর দুম্বা নাটোরের সবুজ খামারে: ঈদকে সামনে রেখে ক্রেতা-দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়
ডেক্স নিউজ:
মাত্র আট বছর বয়সে পিতৃহীন হওয়া হান্নান সরকারের শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। বাবার মৃত্যুর পর মাত্র দুই-তিনটি ছাগল নিয়ে যে জীবনসংগ্রাম শুরু করেছিলেন, দুই ভাই আনোয়ার ও ফেরদৌস সরকারের সহযোগিতায় আজ তা রূপ নিয়েছে এক বিশাল সাম্রাজ্যে। ৩২ বিঘা জমির ওপর গড়ে ওঠা এই সমন্বিত খামারে এখন শুধু দুম্বাই নয়, রয়েছে গরু, গাড়ল এবং ১৪ প্রজাতির ছাগল।
হান্নানের বড় পরিসরে খামার জীবনের পথচলা শুরু ২০১০ সালে গাড়ল পালনের মাধ্যমে। তবে বৈচিত্র্যের খোঁজে এরপর তিনি পরিচিত ব্যবসায়ীদের সহায়তায় ভারত থেকে তিনটি মাদি ও একটি পুরুষ দুম্বা সংগ্রহ করেন। সেই চার সদস্যের দুম্বা পরিবার থেকেই বংশবৃদ্ধি হতে হতে আজ খামারে দুম্বার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬০-এ। এবার কোরবানির ঈদকে লক্ষ্য করে খামারে সম্পূর্ণ প্রস্তুত করা হয়েছে ৩০টি হৃষ্টপুষ্ট দুম্বা। জাত, আকার ও শারীরিক গঠনভেদে এই দুম্বাগুলোর দাম হাঁকানো হচ্ছে ১ লাখ থেকে শুরু করে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত।
শুরুর দিকে দুম্বা নিয়ে মানুষের মাঝে তেমন একটা জানাশোনা বা চাহিদা না থাকলেও, সময়ের সাথে সাথে চিত্রটা পুরোপুরি বদলে গেছে। এখন কোরবানি উপলক্ষে দেশের দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসছেন দুম্বা কিনতে। আবার কেউ কেউ স্রেফ এই ব্যতিক্রমী প্রাণীটিকে চোখের দেখা দেখতেই ভিড় জমাচ্ছেন খামারে। যেমন নাটোর সদর উপজেলার তেবাড়িয়া থেকে আসা দর্শনার্থী দিপু জানালেন, এতদিন শুধু ভিডিওতেই মরুভূমির এই প্রাণী দেখেছেন, আজ সামনাসামনি দেখতে পেরে তিনি দারুণ উচ্ছ্বসিত। তার মতে, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এগিয়ে এলে দেশে এটি অত্যন্ত লাভজনক একটি খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে পারে।
খামারের প্রাণীদের রসনা বিলাসেও রয়েছে শতভাগ প্রাকৃতিক ছোঁয়া। কোনো কৃত্রিম উপায়ে নয়, বরং সম্পূর্ণ নিরাপদ দেশীয় খাদ্যে বড় করা হচ্ছে পশুগুলোকে। প্রতিদিন দুই বেলা খড় ও ভূষির পাশাপাশি দুপুরে দেওয়া হয় তাজা সবুজ ঘাস। আর এই ঘাসের চাহিদা মেটাতে হান্নান সরকার নিজেই সাড়ে ছয় বিঘা জমিতে উন্নত জাতের ঘাস চাষ করেছেন।
হান্নানের এই অভাবনীয় সাফল্য কেবল তার নিজের ভাগ্যই বদলায়নি, সৃষ্টি করেছে অনেকের কর্মসংস্থান। বর্তমানে ২৩ জন শ্রমিক দিনরাত পরিশ্রম করছেন এই খামারের বিশাল কর্মযজ্ঞ সামাল দিতে। ১০ বছর ধরে এখানে কর্মরত শ্রমিক শফিকুল ইসলাম জানান, এখানে কাজ করার আগে তিনি কখনো দুম্বা দেখেননি, আর এখন নিজ হাতে এগুলোর যত্ন নেন। ঈদ ঘনিয়ে আসায় ক্রেতাদের বাড়তি চাপ সামলাতে এখন তাদের ব্যস্ততার কমতি নেই।
হান্নান সরকার এখন শুধু নিজের খামার নিয়েই ভাবেন না, বরং অন্য খামারিদের উৎপাদিত দুম্বা বাজারজাতকরণেও বড় ভূমিকা রাখছেন। গত কোরবানির ঈদে নিজের ও অন্যদের মিলিয়ে মোট ৮০টি দুম্বা বিক্রি করেছিলেন তিনি। তবে এবার ক্রেতাদের যে অভূতপূর্ব সাড়া মিলছে, তাতে দুম্বা বিক্রির সংখ্যা দুই শতাধিক ছাড়িয়ে যাবে বলে বুকভরা আশা তার।
এ বিষয়ে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. সেলিম উদ্দীন জানান, দুম্বা শুষ্ক অঞ্চলের প্রাণী হলেও বাংলাদেশের আবহাওয়ার সাথে এরা চমৎকারভাবে মানিয়ে নিয়েছে। এমনকি দেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে এখন দুম্বা পালন আরও সম্ভাবনাময় হয়ে উঠেছে। প্রাণিসম্পদ দপ্তর থেকে খামারিদের নিয়মিত কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
চলতি বছর নাটোর জেলায় ২১ হাজার ৩৭৪টি খামারে কোরবানির জন্য প্রায় পৌনে পাঁচ লাখ পশু প্রস্তুত করা হয়েছে, যা জেলার স্থানীয় চাহিদার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। হান্নান সরকারের খামারের এই দুম্বা এবং অন্যান্য উদ্বৃত্ত পশু স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এবারো রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের কোরবানির পশুর হাটগুলোতে রাজত্ব করবে, এমনটাই প্রত্যাশা সবার।