কারাগারে মায়েদের সঙ্গে থাকা শিশুদের বিস্তারিত তথ্য চেয়েছেন হাইকোর্ট
দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দি নারীদের সঙ্গে অবস্থানরত শিশুদের সংখ্যা, বয়স এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য সম্বলিত একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আগামী দুই মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এ প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।
সোমবার (১৫ জুন) বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি মো. জিয়াউল হকের সমন্বয়ে
গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে এ আদেশ দেন। একই সঙ্গে কারাগারে
থাকা শিশুদের কল্যাণ, নিরাপত্তা ও উন্নত জীবনযাত্রা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ
গ্রহণে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করা হয়েছে।
রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট কামরুন নাহার মাহমুদ দীপা। রাষ্ট্রপক্ষে
আদালতে উপস্থিত ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. ফারুক হোসেন।
আদালত স্বরাষ্ট্র সচিব, আইন সচিব, সমাজকল্যাণ সচিব এবং কারা মহাপরিদর্শককে
চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে নির্দেশ দিয়েছেন।
উল্লেখ্য, গত ৯ জুন একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত ‘কারাগারে বিপন্ন শৈশব’ শীর্ষক প্রতিবেদনের
প্রেক্ষিতে এ রিট আবেদন দায়ের করা হয়।
কারাগারে শিশুদের অবস্থান
বাংলাদেশ কারাবিধির ৯৫৭ নম্বর বিধান অনুযায়ী, নারী বন্দিরা সাধারণত চার বছর
বয়স পর্যন্ত সন্তানকে সঙ্গে রাখতে পারেন। বিশেষ পরিস্থিতিতে কারা কর্তৃপক্ষের অনুমোদন
সাপেক্ষে এই সময়সীমা ছয় বছর পর্যন্ত বাড়ানো যায়।
কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২৬ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত দেশের ৭৪টি কেন্দ্রীয়
ও জেলা কারাগারে বন্দি মায়েদের সঙ্গে মোট ২৯৯ জন শিশু বসবাস করছে। এর মধ্যে ১৫৩ জন
কন্যাশিশু এবং ১৪৬ জন পুত্রশিশু। এসব শিশুর মায়েদের কেউ সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি, আবার কেউ
বিচারাধীন মামলার হাজতি।
কারা কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব নারী মাদক-সংক্রান্ত
মামলার আসামি।
বিভাগভিত্তিক শিশুদের সংখ্যা
ঢাকা বিভাগের ১৮টি কারাগারে: ১০০ শিশু
চট্টগ্রাম বিভাগের ১২টি কারাগারে: ৯০ শিশু
রাজশাহী বিভাগের ৮টি কারাগারে: ২৫ শিশু
রংপুর বিভাগের ৮টি কারাগারে: ২৫ শিশু
খুলনা বিভাগের ১০টি কারাগারে: ২০ শিশু
সিলেট বিভাগের ৫টি কারাগারে: ১৯ শিশু
ময়মনসিংহ বিভাগের ৪টি কারাগারে: ১৩ শিশু
বরিশাল বিভাগের ৬টি কারাগারে: ৪ শিশু
সবচেয়ে বেশি শিশু কাশিমপুর মহিলা কারাগারে
তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারেই বন্দি মায়েদের
সঙ্গে সবচেয়ে বেশি শিশু রয়েছে। গত ৪ মে পর্যন্ত পাওয়া হিসাব অনুযায়ী সেখানে মোট ৫১
জন শিশু অবস্থান করছিল। তাদের মধ্যে ২৪ জন ছেলে এবং ২৭ জন কন্যাশিশু।
শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ
কারাগারে থাকা এসব শিশু সাধারণত মায়েদের সঙ্গে একই ওয়ার্ড বা নির্ধারিত সেলে
বসবাস করে। সেখানে হত্যা, মাদকসহ বিভিন্ন গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত বা দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদেরও
অবস্থান থাকে। ফলে শিশুদের স্বাভাবিক মানসিক ও সামাজিক বিকাশ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা নিয়ে
উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে, কোনো শিশুর বয়স ছয় বছর অতিক্রম করলে এবং মা কারাগারে অবস্থান করলে
প্রথমে স্বজনদের কাছে শিশুটিকে হস্তান্তরের চেষ্টা করা হয়। স্বজন না থাকলে সমাজসেবা
অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে সরকারি শিশুনিবাসে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা হয়।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, কারাগারে বেড়ে ওঠা শিশুদের জন্য আলাদা পরিচর্যা, শিক্ষা,
বিনোদন ও মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। হাইকোর্টের সাম্প্রতিক নির্দেশনা এ বিষয়ে
নতুন করে গুরুত্ব সৃষ্টি করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।