বিশ্বকাপের নতুন সূর্যরা: মেসি-রোনালদোর বিদায়ের মঞ্চে তারুণ্যের ঝলক

 প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬, ০৭:৫১ পূর্বাহ্ন   |   জাতীয়

বিশ্বকাপের নতুন সূর্যরা: মেসি-রোনালদোর বিদায়ের মঞ্চে তারুণ্যের ঝলক

সফি:

ফুটবল বিশ্বে এক যুগের সমাপ্তি আর আরেক যুগের সূচনার সাক্ষী হচ্ছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো জুড়ে আয়োজিত ইতিহাসের প্রথম ৪৮ দলের এই আসরে যেমন শেষবারের মতো বিশ্বমঞ্চে দেখা যেতে পারে লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর মতো কিংবদন্তিদের, তেমনি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন নতুন প্রজন্মের একঝাঁক প্রতিভাবান ফুটবলার।

তাদের কারও বয়স মাত্র ১৭, কারও ১৮ কিংবা ২১। কিন্তু মাঠে তাদের আত্মবিশ্বাস, দক্ষতা আর প্রভাব দেখে তা বোঝার উপায় নেই। ড্রিবলিং, গোল, সৃজনশীল পাস কিংবা নেতৃত্বসবকিছু মিলিয়ে তারাই হয়ে উঠছেন ফুটবলের আগামী দিনের মুখ।

 বিশ্বকাপে তরুণদের উত্থানের ঐতিহ্য

বিশ্বকাপের ইতিহাসে তরুণদের বিস্ময়কর উত্থান নতুন কিছু নয়। ১৯৫৮ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ জেতানোর মাধ্যমে পেলে যে ঐতিহ্যের সূচনা করেছিলেন, তা আজও অব্যাহত।

২০১০ সালে থমাস মুলার গোল্ডেন বুট জিতে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিলেন। ২০১৪ সালে হামেস রদ্রিগেজ হয়ে উঠেছিলেন টুর্নামেন্টের সবচেয়ে আলোচিত নাম। ২০১৮ সালে কিলিয়ান এমবাপ্পে কিশোর বয়সেই বিশ্বকাপ জিতে পেলের পাশে জায়গা করে নেন। সর্বশেষ কাতার বিশ্বকাপে এনজো ফার্নান্দেজ সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের পুরস্কার জিতে দেখিয়ে দেন, বড় মঞ্চে তারুণ্যই অনেক সময় সবচেয়ে বড় শক্তি।

এবারও সেই ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে বলেই বিশ্বাস করছেন ফুটবল বিশ্লেষকরা।

 লামিনে ইয়ামাল: স্পেনের নতুন বিস্ময়

মাত্র ১৮ বছর বয়সেই ইউরোপীয় ফুটবলের অন্যতম আলোচিত নাম লামিনে ইয়ামাল। বার্সেলোনার এই উইঙ্গার ইতোমধ্যে স্পেন জাতীয় দলের অপরিহার্য সদস্যে পরিণত হয়েছেন।

ইউরো ২০২৪-এ ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা হওয়ার পর তাঁর জনপ্রিয়তা আরও বেড়েছে। গত মৌসুমে ২৪ গোল ও ১৮ অ্যাসিস্ট করে তিনি প্রমাণ করেছেন, বড় মঞ্চে নিজেকে তুলে ধরার ক্ষমতা তাঁর আছে। অনেকেই তাঁকে ভবিষ্যতের ব্যালন ডিঅর জয়ী হিসেবেও দেখছেন।

 এন্দ্রিক: ব্রাজিলের নতুন আশার নাম

ব্রাজিলিয়ান ফুটবলে প্রতিভার অভাব কখনোই ছিল না। সেই ধারাবাহিকতায় এবার আলোচনায় এন্দ্রিক।

রিয়াল মাদ্রিদে নিয়মিত সুযোগ না পেলেও লিয়ঁতে ধারে গিয়ে নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেছেন এই ১৯ বছর বয়সী স্ট্রাইকার। গতি, শক্তি ও গোল করার প্রবল ক্ষুধা তাঁকে ইতোমধ্যে ব্রাজিলের ভবিষ্যৎ তারকাদের কাতারে নিয়ে গেছে।

ব্রাজিল সমর্থকদের আশা, বিশ্বকাপের মঞ্চেই তিনি নিজেকে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত করবেন।

 আর্দা গুলের: তুরস্কের স্বপ্নের কারিগর

রিয়াল মাদ্রিদের তরুণ মিডফিল্ডার আর্দা গুলের এখন তুরস্কের সবচেয়ে বড় ভরসার নাম।

বাঁ পায়ের নিখুঁত পাস, দূরপাল্লার শট এবং সেট-পিস দক্ষতায় তিনি ইতোমধ্যে ইউরোপের নজর কাড়েছেন। দীর্ঘ ২৪ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরা তুরস্কের বড় স্বপ্নের কেন্দ্রে রয়েছেন এই ২১ বছর বয়সী ফুটবলার।

তুর্কি সমর্থকদের বিশ্বাস, তাঁর নেতৃত্বেই দলটি বড় কোনো চমক উপহার দিতে পারে।

 নিকো পাজ: আর্জেন্টিনার নীরব অস্ত্র

আর্জেন্টিনার নতুন প্রজন্মের সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল নামগুলোর একটি নিকো পাজ।

কোমোর হয়ে ইতালিয়ান ফুটবলে দুর্দান্ত মৌসুম কাটানো এই মিডফিল্ডার গোল করার পাশাপাশি আক্রমণ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বাঁ পায়ের নিপুণতা এবং খেলার গতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতার কারণে অনেকেই তাঁর মধ্যে ভবিষ্যৎ তারকার ছাপ দেখতে পাচ্ছেন।

গেসিম ইয়াসিন: মরক্কোর নতুন আলো

২০২২ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালিস্ট মরক্কো এবারও চমক দেখাতে চায়। সেই স্বপ্নের অন্যতম মুখ ২০ বছর বয়সী উইঙ্গার গেসিম ইয়াসিন।

স্ট্রাসবুর্গে খেলা এই তরুণকে ইতোমধ্যে ইউরোপের বেশ কয়েকটি বড় ক্লাব পর্যবেক্ষণ করছে। জাতীয় দলের হয়ে তাঁর দ্রুত উত্থান মরক্কোর সমর্থকদের মধ্যে নতুন আশার জন্ম দিয়েছে।

গিলবার্তো মোরা: স্বাগতিক দেশের কিশোর সেনসেশন

বিশ্বকাপের সবচেয়ে কম বয়সী ফুটবলার হিসেবে আলোচনায় আছেন মেক্সিকোর গিলবার্তো মোরা।

মাত্র ১৭ বছর বয়সেই জাতীয় দলের জার্সিতে অভিষেক হওয়া এই মিডফিল্ডার নিজের দেশের মাটিতে বিশ্বকাপ খেলতে নামছেন। স্বাগতিক দর্শকদের প্রত্যাশার বড় অংশ জুড়েই রয়েছে তাঁর নাম।

 যাদের দিকে থাকবে বাড়তি নজর

মূল আলোচনার বাইরে আরও কয়েকজন তরুণ ফুটবলার এবারের বিশ্বকাপে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে পারেন।

ইকুয়েডরের কেন্দ্রি পায়েজ, স্পেনের পাউ কুবার্সি, ক্রোয়েশিয়ার লুকা ভুসকোভিচ, তুরস্কের কেনান ইলদিজ, ব্রাজিলের রায়ান, জাপানের তাকেফুসা কুবো এবং সৌদি আরবের মুসাব আল-জুওয়াইরসবাই নিজ নিজ দলের ভবিষ্যৎ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।

তাদের কেউ হয়তো বিশ্বকাপ শেষে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার হয়ে উঠবেন।

 নতুন প্রজন্মের হাতে ফুটবলের আগামী

বিশ্বকাপ মানেই নতুন নায়ক জন্ম নেওয়ার গল্প। ইতিহাস বলে, অনেক সময় সবচেয়ে বড় তারকারা নয়, বরং অপ্রত্যাশিত কোনো তরুণই বদলে দেন পুরো টুর্নামেন্টের চিত্র।

স্পেনের জন্য ইয়ামাল, ব্রাজিলের জন্য এন্দ্রিক কিংবা তুরস্কের জন্য গুলেরতাদের প্রত্যেকের সামনে রয়েছে নিজেকে ইতিহাসের পাতায় তুলে ধরার সুযোগ।

আর বাংলাদেশের কোটি ফুটবলপ্রেমীও অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন সেই নতুন নায়কের জন্ম দেখার জন্য। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থনের আবেগের মাঝেও সবার প্রত্যাশা একটাইফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে নতুন প্রজন্ম লিখুক নতুন ইতিহাস।

২০২৬ বিশ্বকাপ তাই শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়; এটি ফুটবলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের সন্ধান পাওয়ারও এক অনন্য মঞ্চ।

Advertisement
Advertisement
Advertisement