চলনবিলের জলতরঙ্গে শিক্ষার আলো: ইউনেস্কো পুরস্কারে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের ভাসমান বিদ্যালয়

 প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬, ০৪:৫৬ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

চলনবিলের জলতরঙ্গে শিক্ষার আলো: ইউনেস্কো পুরস্কারে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের ভাসমান বিদ্যালয়

​বিশেষ প্রতিবেদক | ঢাকা

​বর্ষার দিগন্তজোড়া জলরাশি আর থৈ থৈ ঢেউয়ের মাঝে যে শিশুরা একসময় শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত থাকত, আজ তাদের জীবনের গল্পটা বদলে গেছে। শুধু বদলে যাওয়া নয়, বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সেই রূপান্তরের গল্প এবার জয় করেছে বিশ্বমঞ্চ। দেশের বৃহত্তম জলাভূমি অঞ্চল চলনবিলে সৌরশক্তিচালিত ভাসমান বিদ্যালয়ের মাধ্যমে দুর্গম ও জলবেষ্টিত এলাকার শিশু-কিশোরদের কাছে শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে মর্যাদাপূর্ণ ‘ইউনেস্কো কনফুসিয়াস সাক্ষরতা পুরস্কার ২০২৫’ অর্জন করেছে দেশীয় স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা 'সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থা'। আন্তর্জাতিক এই স্বীকৃতি শুধু চলনবিলের প্রান্তিক শিশুদের ভাগ্যবদলের গল্পকেই সামনে আনেনি, বরং বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের উদ্ভাবনী ও মানবিক শিক্ষা উদ্যোগের এক অনন্য গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় রচনা করেছে।

​জলবায়ু পরিবর্তনের চরম ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশে বন্যা ও জলাবদ্ধতা একটি নিয়মিত বাস্তব। বছরের একটা বড় সময় চলনবিল অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে থাকে। ফলে প্রথাগত স্কুলগুলো বন্ধ হয়ে যায়, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে হাজারো পরিবার। এমন এক প্রতিকূল পরিস্থিতিতে প্রথাগত ধারণার বাইরে গিয়ে এক অভিনব সমাধান নিয়ে আসে সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থা। তারা ভাবল, শিশুরা যদি স্কুলে যেতে না পারে, তবে স্কুলই পৌঁছে যাবে শিশুদের দোরগোড়ায়। এই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় ভাসমান বিদ্যালয়ের ধারণা। স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত নৌকাগুলোকে রূপান্তর করা হয় আধুনিক শ্রেণিকক্ষে।

​এই ভাসমান বিদ্যালয়গুলো কেবল সাধারণ কোনো নৌকা নয়, বরং প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক শিক্ষার এক একটি চলমান কেন্দ্র। প্রতিটি নৌকার ছাদে বসানো হয়েছে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল, যা থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতে চলে ভেতরের আলো, পাখা এবং কম্পিউটার। প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকার যে শিশুরা কখনো বিদ্যুতের আলো দেখেনি, তারা এই নৌকায় বসে ল্যাপটপ ব্যবহার করছে, ইন্টারনেটের দুনিয়ার সাথে পরিচিত হচ্ছে এবং ডিজিটাল শিক্ষা গ্রহণ করছে। জলমগ্নতার কারণে বছরের যে সময়টায় পুরো অঞ্চলের শিক্ষা কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ার কথা, ঠিক সেই সময়েই এই নৌকাস্কুলগুলো গ্রামের পর গ্রাম ঘুরে শিশুদের ডেকে নেয় শিক্ষার আঙিনায়।

​ইউনেস্কো জানিয়েছে, শিক্ষাক্ষেত্রে প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবন, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা বিস্তার এবং গ্রামীণ অবহেলিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে সাক্ষরতা উন্নয়নে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখার কারণেই সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থাকে এই মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে ভূষিত করা হয়েছে। এই পুরস্কারের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রমাণ হলো যে, সদিচ্ছা আর সঠিক উদ্ভাবনী চিন্তা থাকলে চরম প্রাকৃতিক দুর্যোগকেও জয় করে শিক্ষার আলো জ্বেলে রাখা সম্ভব।

​চলনবিলের এই মডেলটি কেবল প্রাথমিক শিক্ষার মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। দিনের বেলা শিশুরা যখন এখানে প্রথাগত শিক্ষা শেষ করে বাড়ি ফেরে, সন্ধ্যার পর সেই একই নৌকা রূপ নেয় বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্রে। এলাকার কৃষক ও নারীরা সেখানে এসে সাক্ষরতা অর্জনের পাশাপাশি আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার উপায় এবং নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা লাভ করেন। একই সাথে এই ভাসমান বিদ্যালয়গুলোতে গড়ে তোলা হয়েছে ছোটখাটো লাইব্রেরি, যা পুরো নদীমাতৃক জনগোষ্ঠীর জন্য জ্ঞানের আলো ছড়ানোর একটি স্থায়ী মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

​আন্তর্জাতিক এই স্বীকৃতি পাওয়ার পর সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থার পক্ষ থেকে গভীর উচ্ছ্বাস প্রকাশ করা হয়েছে। সংস্থার নীতিনির্ধারকেরা মনে করেন, এই পুরস্কার চলনবিলের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের এবং এই উদ্যোগের সাথে জড়িত প্রতিটি মানুষের অক্লান্ত পরিশ্রমের স্বীকৃতি। এটি প্রমাণ করে যে, উন্নয়নশীল দেশের নিজস্ব ও স্থানীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিশ্বমানের সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। একই সাথে এই সাফল্য আগামী দিনে দেশের অন্যান্য জলবেষ্টিত ও দুর্গম অঞ্চলেও এই ধরনের অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা মডেল ছড়িয়ে দিতে বড় অনুপ্রেরণা জোগাবে।

​আজ বিশ্ব যখন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শিক্ষা ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে, তখন বাংলাদেশের চলনবিলের এই ভাসমান বিদ্যালয় পুরো পৃথিবীর সামনে একটি রোল মডেল হিসেবে দাঁড়িয়েছে। ঢেউয়ের বুকে ভেসে চলা এই পাঠশালাগুলো কেবল অক্ষরজ্ঞানই দিচ্ছে না, বরং প্রান্তিক শিশুদের চোখে বুনে দিচ্ছে আকাশছোঁয়া স্বপ্নের বীজ। ইউনেস্কো কনফুসিয়াস পুরস্কারের এই গৌরবময় প্রাপ্তি বাংলাদেশের সেই স্বপ্নযাত্রাকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল, যা প্রমাণ করে দুর্যোগের অন্ধকারেও বাংলাদেশ পথ হারাতে জানে না।

Advertisement
Advertisement
Advertisement