পদ্মা ব্যারেজ: দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি সংকট নিরসনে নতুন আশা, তবে রয়ে গেছে পরিবেশগত সতর্কতা

 প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬, ০৭:২৫ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

পদ্মা ব্যারেজ: দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি সংকট নিরসনে নতুন আশা, তবে রয়ে গেছে পরিবেশগত সতর্কতা

ডেক্স নিউজ:

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গঙ্গা-নির্ভর বিস্তীর্ণ এলাকা নদীর পানিপ্রবাহ হ্রাস, সেচ সংকট এবং ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততার কারণে নানামুখী দুর্ভোগের শিকার। কৃষি উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিবেশ ও জনজীবনসব ক্ষেত্রেই এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট। এমন বাস্তবতায় একনেক অনুমোদিত ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকার ‘পদ্মা (গঙ্গা) ব্যারেজ প্রকল্প’ অঞ্চলজুড়ে নতুন আশার আলো জাগিয়েছে।

সাত বছর মেয়াদি এই বৃহৎ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো পদ্মা ও এর শাখা নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধার, সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত জলজ ও পরিবেশগত ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার হাবাসপুর ইউনিয়নের চরঝিকড়ী গ্রামের কাছে ব্যারেজটি নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

কৃষকের প্রত্যাশা: সেচে মিলবে স্থায়ী সমাধান

স্থানীয় কৃষকদের কাছে প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো নদীর পানি ব্যবহার করে নির্ভরযোগ্য সেচ ব্যবস্থা গড়ে তোলার সম্ভাবনা। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ভূমির মালিক আইয়ুব কাজীর মতে, কৃষিকাজে ভূগর্ভস্থ পানির তুলনায় নদীর পানি অনেক বেশি উপযোগী।

তিনি জানান, এলাকার ভূগর্ভস্থ পানিতে আয়রনের পরিমাণ বেশি হওয়ায় তা চাষাবাদের জন্য সবসময় উপকারী নয়। অন্যদিকে জ্বালানি সংকটের কারণে ডিজেলচালিত সেচ পাম্প পরিচালনাও ব্যয়বহুল ও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। ফলে নদীকেন্দ্রিক সেচ ব্যবস্থার বিকল্প নেই বলেই মনে করছেন তিনি।

উন্নয়নের স্বপ্ন দেখছেন স্থানীয়রা

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে শুধু কৃষি উৎপাদনই বাড়বে না, সামগ্রিকভাবে অঞ্চলের অর্থনীতি ও জীবনমানেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের বিশ্বাস, ব্যারেজ নির্মাণকে কেন্দ্র করে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যেও গতি আসবে।

তবে একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর যথাযথ পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রকল্প বাস্তবায়নের কারণে যারা ক্ষতির মুখে পড়বেন, তাদের স্বার্থ রক্ষায় সরকারকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে এবং কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর প্রতি পক্ষপাতিত্ব করা যাবে না।

লবণাক্ততা ও পরিবেশ সংকট মোকাবিলার সম্ভাবনা

পানি বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ার প্রভাব কৃষির গণ্ডি ছাড়িয়ে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশেও গভীর সংকট সৃষ্টি করেছে। অবসরপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী আক্তার হোসেন সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে খুলনা অঞ্চলের কিছু এলাকা বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়তে পারে।

উপকূলীয় অঞ্চলের বিভিন্ন সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, অনেক এলাকায় টিউবওয়েল থেকে লবণাক্ত পানি উঠছে, ফলে নিরাপদ পানীয় জলের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। এর প্রভাব পড়েছে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনেও। পরিবেশবাদীদের মতে, লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে সুন্দরী গাছের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাচ্ছে।

 

নদীর প্রবাহ বাড়লে উপকৃত হবে লাখো কৃষক

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বিডব্লিউডিবি) মনে করছে, শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণ করে গঙ্গার শাখা নদীগুলোতে পর্যাপ্ত প্রবাহ নিশ্চিত করা গেলে বর্তমান পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি সম্ভব হবে।

কুষ্টিয়ার নির্বাহী প্রকৌশলী রাশিদুর রহমান জানান, গড়াই, মধুমতী ও হিষনা নদীতে পানির স্তর ধরে রাখতে প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। নদীর পানির স্তর প্রায় ১০ মিটারে স্থিতিশীল রাখা গেলে গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) সেচ প্রকল্পের আওতা ৫৫ হাজার হেক্টর থেকে বাড়িয়ে ৯৫ হাজার হেক্টরে উন্নীত করা সম্ভব হবে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের ধারণা, উন্নত সেচ ব্যবস্থা, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং মৎস্যসম্পদের বিকাশের মাধ্যমে দেশের ১৯টি জেলার প্রায় সাত কোটি মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে।

জিকে সেচ প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বলেন, বর্তমানে পাম্প সচল রাখতে ন্যূনতম ৩ দশমিক ৯ মিটার পানির স্তর প্রয়োজন হয়। এর নিচে নেমে গেলে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং কৃষকরা ক্ষতির মুখে পড়েন। ব্যারেজ নির্মাণের পর শুষ্ক মৌসুমেও প্রয়োজনীয় পানির স্তর বজায় রাখা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদী।

আশার পাশাপাশি রয়েছে কিছু শঙ্কাও

যদিও প্রকল্পটি নিয়ে ব্যাপক উৎসাহ রয়েছে, তবুও পানি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা এটিকে শতভাগ ঝুঁকিমুক্ত সমাধান হিসেবে দেখছেন না। তাদের মতে, বড় ধরনের ব্যারেজ নির্মাণ নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পলি পরিবহন এবং পরিবেশগত ভারসাম্যে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রকৌশলী আক্তার হোসেনের মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে আধুনিক কম্পিউটার মডেলিং ও বিস্তৃত বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে সম্ভাব্য ঝুঁকি মূল্যায়ন করা জরুরি। এতে নেতিবাচক প্রভাব অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

অন্যদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক জসিম উদ্দিন আহমদ গঙ্গার পলির সঙ্গে প্রবাহিত ভারী ধাতু ও অন্যান্য দূষণকারী উপাদান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, এসব দূষক দীর্ঘমেয়াদে মানুষের স্বাস্থ্য এবং নদী ব্যবস্থার জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

সফলতার চাবিকাঠি হবে সুষম পরিকল্পনা

বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ পানি অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত পদ্মা ব্যারেজকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা অনেক। তাদের কাছে এটি শুধু একটি প্রকৌশল স্থাপনা নয়; বরং পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কৃষিকে টিকিয়ে রাখা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবন-জীবিকা রক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।

তবে বিশেষজ্ঞদের অভিমত, প্রকল্পটির প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে শুধু নির্মাণকাজের মানের ওপর নয়, বরং পরিবেশগত ঝুঁকি, নদীর স্বাভাবিক গতিশীলতা এবং স্থানীয় জনগণের স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত রাখা যায়, তার ওপরও। সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে পদ্মা ব্যারেজ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য একটি যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement