স্মার্ট ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট অ্যাপে নাগরিক তথ্য ফাঁসের আশঙ্কা

 প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬, ০২:৫৫ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

স্মার্ট ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট অ্যাপে নাগরিক তথ্য ফাঁসের আশঙ্কা

অনলাইন ডেস্ক:

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ডামাডোলের আড়ালে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। ভোটারদের ভোটকেন্দ্রের তথ্য জানানোর উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত ‘স্মার্ট ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক নাগরিকের ছবি ও ২৮ ধরনের ডেমোগ্রাফিক তথ্য বেসরকারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ বিশেষ ইউজার আইডি ও এপিআই সরবরাহ করায় এই সুযোগ তৈরি হয়। অথচ ভোটকেন্দ্রের তথ্য জানাতে মাত্র চার ধরনের তথ্যই যথেষ্ট ছিল।

প্রথমদিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া আইডি ও এপিআই ব্যবহার করে অস্বাভাবিক হারে তথ্যভান্ডারে প্রবেশ করা হয়। বিষয়টি নজরে আসার পর ভোটের আগের শুক্রবার জরুরি বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়—শুধু চার ধরনের তথ্য (ভোটার নম্বর, সিরিয়াল নম্বর, জন্ম তারিখ ও লিঙ্গ) দেওয়া হবে। কিন্তু এর আগেই এক কোটির বেশি হিট হয়ে যায় অ্যাপে। ফলে বিপুলসংখ্যক নাগরিকের তথ্য কপি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

তথ্যভান্ডার স্পর্শকাতর হওয়ায় কতসংখ্যক নাগরিকের তথ্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে গেছে তার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব সার্ভারে তথ্য সংরক্ষণ করেছে কি না তাও নিশ্চিত নয়। তবে একটি সূত্র জানিয়েছে, অ্যাপে মোট সাত কোটির বেশি হিট হয়েছে। এখনো পর্যন্ত এনআইডি তথ্যভান্ডারের কোনো আইটি অডিট হয়নি, কিংবা সফটওয়্যারের সঙ্গে কীভাবে ইন্টিগ্রেশন করা হয়েছে তা পরীক্ষা করা হয়নি।

আইডিইএ-২ প্রকল্পের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আজিজুর রহমান সিদ্দিকী এক চিঠিতে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, বিপুলসংখ্যক নাগরিকের সংবেদনশীল তথ্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সার্ভারে সংরক্ষিত থাকতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, সেবাটি প্রদানের ক্ষেত্রে গুরুতর কারিগরি গাফিলতি হয়েছে, যা দেশের ভোটারদের তথ্য নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন জানিয়েছেন, অ্যাপের মাধ্যমে ভোটকেন্দ্রের তথ্য জানানোর ফাইল তিনি অনুমোদন করেছিলেন। তবে কীভাবে তথ্য সরবরাহ করা হয়েছে, সে বিষয়ে কারিগরি কর্মকর্তারাই জানেন। সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদও স্বীকার করেছেন যে প্রথমদিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে অনেক ধরনের তথ্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। পরে তা সীমিত করে চার ধরনের তথ্য সরবরাহের সিদ্ধান্ত হয়। তিনি বলেন, এনআইডি তথ্যভান্ডারের ফরেনসিক অডিট ও নিরাপত্তা ত্রুটি পরীক্ষা করা হবে।

অ্যাপটি প্রথম ব্যবহার করা হয় ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে। একই প্রতিষ্ঠান ২০২৬ সালের নির্বাচনে আবারও কারিগরি সহায়তা দেয়। নির্বাচনের আগে আইসিটি বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন সিনিয়র মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার বেগম ফারজানা আখতার। তার নেতৃত্বে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ইউজার আইডি ও এপিআই সরবরাহ করা হয়।

তথ্য অনুসন্ধানের সংখ্যা নিয়েও বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। ফারজানা আখতার দাবি করেন, নির্বাচনে অ্যাপে তিন কোটির বেশি হিট হয়েছে। অন্যদিকে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগ জানিয়েছে, ভোটের আগে কয়েক দিনে কোটি কোটি বার তথ্য অনুসন্ধান করা হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পেন্টা গ্লোবালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ফয়সাল জামান প্রথমে চার ধরনের তথ্য পাওয়ার কথা বললেও পরে জানান, বিষয়টি তাদের কারিগরি কর্মকর্তারা ভালো জানেন। তবে তিনি দাবি করেন, নাগরিকদের তথ্য তারা সংরক্ষণ করেননি।

সব মিলিয়ে এই ঘটনায় নির্বাচন কমিশনের ভেতরে তথ্যের অসঙ্গতি ও গোপনীয়তা লঙ্ঘনের আশঙ্কা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, আর এ নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। এখনো পর্যন্ত কোনো কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

Advertisement
Advertisement
Advertisement