হাওরে বন্যার ছোবল: পচা ধানের গন্ধে নিভে যাচ্ছে কৃষকের স্বপ্ন

 প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬, ০৪:০২ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

হাওরে বন্যার ছোবল: পচা ধানের গন্ধে নিভে যাচ্ছে কৃষকের স্বপ্ন

স্টাফ রিপোর্টার

পাঁচ দিন পর হাওরের আকাশে সূর্যের দেখা মিললেও স্বস্তি ফেরেনি কৃষকের জীবনে। পানি কিছুটা কমলেও বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতির কোনো আশ্বাস নেই। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, টানা ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে সৃষ্ট এ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও অন্তত এক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।

এদিকে পানির নিচে তলিয়ে যাওয়া পাকা ধান নিয়ে সব আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছেন কৃষকরা। মাঠে এখন আর সোনালি ধানের ঘ্রাণ নেই—চারদিকে ভাসছে পচা ধানের তীব্র দুর্গন্ধ, সঙ্গে হতাশা আর নিরাশার ছায়া। যেখানে এ সময় উৎসবমুখর পরিবেশ থাকার কথা, সেখানে বিরাজ করছে নীরবতা।

বিপর্যস্ত হাওরাঞ্চল

দেশের হাওরাঞ্চলের সাত জেলায় চলতি মৌসুমে প্রায় ৪ লাখ ৫৫ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছিল। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৯ লাখ টনের বেশি। এর মধ্যে প্রায় তিন লাখ হেক্টরের ধান কাটা গেলেও বাকি অংশ এখন অনিশ্চয়তার মুখে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর জমির ধান ইতোমধ্যে পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সুনামগঞ্জে, যেখানে ১৪ হাজার হেক্টরের বেশি জমি ডুবে গেছে এবং মাত্র ৫১ শতাংশ ধান কাটা সম্ভব হয়েছে। কিশোরগঞ্জে প্রায় ৬ হাজার ৭৬৮ হেক্টর জমি প্লাবিত হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ১৫ হাজার কৃষক। মৌলভীবাজারেও ক্ষতির চিত্র ভয়াবহ।

মাঠে নেই প্রাণচাঞ্চল্য

সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওর ঘুরে দেখা গেছে, ধান কাটার মৌসুমে যেখানে শ্রমিকদের ব্যস্ততা থাকার কথা, সেখানে এখন জনশূন্যতা। অনেক জায়গায় কাটা ধান খলায় স্তূপ করে রাখা হলেও বৃষ্টির পানিতে ভিজে অঙ্কুরোদগম হয়েছে। ফলে সেই ধান থেকেও বের হচ্ছে দুর্গন্ধ।

অনেক কৃষক বুকসমান পানিতে নেমে যা সম্ভব তা রক্ষা করার চেষ্টা করছেন। কেউ কাদায় পা গুঁজে ধান কাটছেন, কেউ আবার ভেজা ধান শুকানোর চেষ্টা করছেন। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ক্ষতির পরিমাণ এত বেশি যে তা পুষিয়ে ওঠা প্রায় অসম্ভব।

ছোট-বড় সব কৃষকই ক্ষতিগ্রস্ত

এই দুর্যোগে শুধু প্রান্তিক কৃষকই নয়, বড় কৃষকরাও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। অনেকেই লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে সম্পূর্ণ ফসল হারিয়েছেন। বাড়ির উঠোনে রাখা ধান পচে যাওয়ায় বসবাসও কষ্টকর হয়ে উঠেছে।

একাধিক কৃষকের অভিযোগ, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, দুর্বল পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং সময়মতো পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। তারা দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর পানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন।

শ্রমিক সংকট ও যান্ত্রিক বাধা

পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে শ্রমিক সংকট। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কম্বাইন হারভেস্টারের ওপর নির্ভরতা বাড়লেও জলাবদ্ধতার কারণে অনেক জায়গায় যন্ত্র ব্যবহার সম্ভব হচ্ছে না। ফলে শ্রমিকের চাহিদা বেড়ে গেলেও সরবরাহ কম, এতে মজুরি বেড়ে দাঁড়িয়েছে দৈনিক ১২০০ টাকার বেশি।

অন্যদিকে ধানের বাজারমূল্য কম থাকায় কৃষকরা দ্বিগুণ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন—একদিকে ফসল নষ্ট, অন্যদিকে খরচ বেড়ে যাওয়া।

উৎপাদন ঘাটতির আশঙ্কা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ক্ষতির প্রভাব জাতীয় খাদ্য উৎপাদনে পড়তে পারে। দেশের মোট চাল উৎপাদনের বড় অংশ আসে বোরো মৌসুম থেকে, যার উল্লেখযোগ্য অংশ হাওরাঞ্চলে উৎপাদিত হয়। ফলে এ ক্ষতি খাদ্য নিরাপত্তায় চাপ তৈরি করতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে কৃষকদের জন্য জরুরি সহায়তা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা যে পদক্ষেপগুলোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন, সেগুলো হলো:

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সরাসরি আর্থিক সহায়তা

কৃষিঋণ মওকুফ ও বিনাসুদে নতুন ঋণ প্রদান ,বিনামূল্যে বীজ ও সার বিতরণ ,দ্রুত ধান কাটার জন্য সরকারি উদ্যোগে যন্ত্র ও শ্রমিক সরবরাহ ,ধান শুকানোর জন্য ড্রায়ার মেশিনের ব্যবস্থা

সরকার ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য খাদ্য ও নগদ সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে এবং মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম জোরদার করার নির্দেশনা দিয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দাবি

প্রতি বছর একই ধরনের দুর্যোগের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে বিশেষজ্ঞরা টেকসই সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছেন। এর মধ্যে রয়েছে: শক্তিশালী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণ,আগাম বন্যা সতর্কীকরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন,জলবায়ু সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন

সমন্বিত হাওর ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা

হাওরের কৃষকরা এখন শুধু বর্তমান ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার লড়াইয়ে নেই, তারা অপেক্ষা করছেন এমন এক ভবিষ্যতের জন্য যেখানে তাদের ঘাম ঝরানো ফসল আর বারবার প্রকৃতির কাছে হার মানবে না।

Advertisement
Advertisement
Advertisement