ইসমাইলকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি আজও অটুট আমার
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
গাজার লেখক ওহুদ নাসের জানিয়েছেন, আল জাজিরার সাংবাদিক ইসমাইল আল-ঘৌল তাকে একদিন বলেছিলেন, নিজের ইংরেজি ভাষাজ্ঞান কাজে লাগিয়ে গাজার মানুষের কণ্ঠ বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দিতে। ২০২৪ সালের ৩১ জুলাই ইসরায়েলি হামলায় ইসমাইল নিহত হওয়ার দুই বছর পরও সেই কথাই তাকে লিখতে অনুপ্রাণিত করে চলেছে।
২০২৪ সালের ৩১ জুলাই সন্ধ্যায় গাজা সিটির রেমাল এলাকায় দুই বোনকে নিয়ে নতুন কাপড় কিনছিলেন ওহুদ। বহু মাস পর সেদিন প্রথমবারের মতো যুদ্ধ শেষ হওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি। হঠাৎ দোকানদার মোবাইল ফোনের দিকে তাকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে জানান, ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইসমাইল আল-ঘৌলকে লক্ষ্য করে আঘাত হানা হয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই নিশ্চিত হয়, তিনি নিহত হয়েছেন।
ওহুদের ভাষায়, ইসমাইলের মৃত্যুতে তিনি শুধু একজন সাংবাদিককে হারানোর শোক করেননি। হারিয়েছেন এমন একজন মানুষকে, যিনি যুদ্ধের কারণে বিচ্ছিন্ন থাকা স্ত্রী ও ছোট মেয়ে জিনার কাছে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতেন এবং জীবনকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন।
আল-শিফা হাসপাতালে আশ্রয় নেওয়ার সময় প্রথমবার ইসমাইলের সঙ্গে পরিচয় হয় ওহুদের। বিদ্যুৎ না থাকায় কয়েক সপ্তাহ ধরে তার মোবাইল ফোন বন্ধ ছিল। ফোনে চার্জ দেওয়ার আশায় বাবার সঙ্গে ইসমাইলের কাছে গেলে তিনি তখন ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে গাজার পরিস্থিতি নিয়ে সরাসরি প্রতিবেদন করছিলেন। সম্প্রচার শেষে পরিচয়ের পর ওহুদের সাবলীল ইংরেজি শুনে তিনি বলেন, "তোমার ইংরেজিটাকে আরও কাজে লাগাও। আমাদের কণ্ঠ বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দাও।"
সেই সময়ে পরামর্শটি বাস্তবায়ন করা প্রায় অসম্ভব ছিল। গাজায় ছিল না বিদ্যুৎ, ছিল না নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট। তবু ইসমাইলের কথাগুলো ওহুদের মনে গেঁথে যায়।
সময়ের সঙ্গে ইসমাইল তাদের পরিবারের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। ওহুদের বাবা তাকে স্নেহ করে "আবু জিনা" বলে ডাকতেন এবং প্রায়ই দোয়া করতেন, যেন তিনি দ্রুত স্ত্রী ও মেয়ের সঙ্গে মিলিত হতে পারেন। প্রতিবার সেই দোয়া শুনে ইসমাইল হাসিমুখে তাকে জড়িয়ে ধরতেন। একদিন আনন্দের সঙ্গে তিনি জানান, অবশেষে স্ত্রী ও মেয়ে জিনার সঙ্গে কথা বলতে পেরেছেন।
ওহুদের বড় ভাই ওদায়ের সঙ্গেও ইসমাইলের ছিল ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব। আল-শিফায় আশ্রয় নেওয়ার সময় ওহুদের বাবা আহত হলে তাকে দেখতে যান তিনি। সুস্থ হয়ে উঠলে একসঙ্গে মাছ খাওয়ানোরও প্রতিশ্রুতি দেন। তখন গাজায় মাছ পাওয়া ছিল অত্যন্ত কঠিন ও ব্যয়বহুল। তবু নিজের ইচ্ছা থেকে সরে আসেননি তিনি।
সবসময় একটি ছোট থার্মোসে গরম কফি সঙ্গে রাখতেন ইসমাইল। একদিন ওদায় বাড়ি ফিরে জানান, তিনি ইসমাইলের সঙ্গে কফি খেয়েছেন। যদিও সাধারণত কফি পান করতেন না। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইসমাইল তাকে বলেছিলেন, "যদি আমাকে ভালোবাসো, তাহলে এই কফিটা খাও।"
২০২৪ সালের জুনে আবারও বাস্তুচ্যুত হয় ওহুদের পরিবার। রেমাল এলাকায় এক পরিচিতের বাড়িতে আশ্রয় নেওয়ার পর প্রথমবারের মতো ফোন চার্জ দেওয়া এবং ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পান তিনি। তখনই ইসমাইলের কথাগুলো মনে পড়ে। ইংরেজিতে গাজার গল্প তুলে ধরতে বিভিন্ন গণমাধ্যমে লেখার সুযোগ খুঁজতে শুরু করেন।
ওহুদের বর্ণনা অনুযায়ী, নিহত হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে আল-শিফা হাসপাতালের কাছে তাদের পারিবারিক গাড়িতে বসে ভাই ওদায়ের সঙ্গে সময় কাটিয়েছিলেন ইসমাইল। পরিচিত সেই থার্মোস থেকে কফি পান করছিলেন, মাথায় ছিল হালকা রঙের একটি ক্যাপ। শেষবারের মতো সংবাদ সংগ্রহে বের হওয়ার সময় তিনি থার্মোস ও ক্যাপটি গাড়িতেই ফেলে যান।
ইসমাইলের মৃত্যুর পর ওহুদের বাবা স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে ক্যাপ ও থার্মোসটি যত্নে রেখে দেন। প্রতিটি বাস্তুচ্যুতির সময়ও সেগুলো সঙ্গে নিয়েছিলেন। পরে উত্তর গাজার ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িতে ফিরে সেগুলো সংরক্ষণ করেছিলেন। কিন্তু ২০২৫ সালের মে মাসে ইসরায়েলি বাহিনীর বোমা হামলার আগে দ্রুত এলাকা ছাড়ার নির্দেশ পেয়ে পরিবারটি কিছুই সঙ্গে নিতে পারেনি। হামলায় বাড়িটি ধ্বংস হয়ে যায়। ধ্বংসস্তূপের নিচে হারিয়ে যায় ইসমাইলের রেখে যাওয়া শেষ স্মৃতিচিহ্নও।
ওহুদের মতে, ওই হামলায় শুধু একজন সাংবাদিক নিহত হননি। প্রাণ হারিয়েছেন এমন এক বাবা, যিনি মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরার অপেক্ষায় ছিলেন; এমন এক স্বামী, যিনি যুদ্ধ শেষে পরিবারের কাছে ফিরতে চেয়েছিলেন; এবং এমন এক বন্ধু, যার মানবিকতা পরিচিত সবার হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিল।
ইসমাইলের মৃত্যুর দুই বছর পরও তার দেওয়া উপদেশই ওহুদের পথ দেখাচ্ছে। তিনি বলেন, ইসমাইলকে দেওয়া একটি প্রতিশ্রুতি আজও তিনি পালন করে চলেছেন-গাজার মানুষের গল্প বিশ্বের সামনে তুলে ধরার সেই অঙ্গীকার।
সূত্র: আলজাজিরা