সিউতা সীমান্তে নিহত ৫৭, বিশৃঙ্খল অভিবাসী ঢল

 প্রকাশ: ০১ অগাস্ট ২০২৬, ১০:১৯ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

সিউতা সীমান্তে নিহত ৫৭, বিশৃঙ্খল অভিবাসী ঢল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ছিটমহল সিউতার সীমান্ত ভেঙে মরক্কো থেকে মাত্র ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ৫০ থেকে ৬০ হাজার অভিবাসী প্রবেশের ঘটনায় নজিরবিহীন মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। এ সময় সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা করতে গিয়ে অন্তত ৫৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে অনেকে সাগরে ডুবে মারা গেছেন, আবার অনেকে সীমান্তের ব্রেকওয়েতে পদদলিত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন।

সিউতার প্রেসিডেন্ট হুয়ান হেসুস ভিভাস জানান, একদিনে প্রবেশ করা মানুষের সংখ্যা শহরটির স্থায়ী জনসংখ্যার প্রায় ৭০ শতাংশের সমান। তবে স্পেন সরকার জানিয়েছে, বিপুল সংখ্যক মানুষের আগমনের পর সৃষ্ট বিশৃঙ্খলার কারণে শুক্রবারের মধ্যেই প্রায় অর্ধেক অভিবাসী স্বেচ্ছায় মরক্কোতে ফিরে গেছেন।

অনেক অভিবাসী কয়েক কিলোমিটার সাগর পাড়ি দিয়ে সাঁতরে সিউতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। তাদের ঠেকাতে স্পেন ও মরক্কোর নিরাপত্তা বাহিনী জলকামান, টিয়ার গ্যাস এবং ফাঁকা গুলি ব্যবহার করে। সীমান্তের তারাজাল সৈকতসংলগ্ন ব্রেকওয়েতে হুড়োহুড়ির সময়ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্পেন অতিরিক্ত পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করেছে। মরক্কো সীমান্তেও নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে অভিবাসীদের সংঘর্ষ হয়। একই সময়ে স্পেনের আরেক উত্তর আফ্রিকান ছিটমহল মেলিয়ায় প্রবেশের চেষ্টাও হয়, যেখানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে।

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ শুক্রবার সিউতা সফর করে ঘটনাকে দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতার ওপর আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর অভিযোগ, মানবপাচারকারী চক্র ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে হাজারো তরুণকে বিপজ্জনক যাত্রায় ঠেলে দিয়েছে, যার পরিণতিতে বহু মানুষ সাগরে কিংবা সীমান্তে প্রাণ হারিয়েছেন।

স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত প্রায় ৫০ হাজার মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করেছেন। শুক্রবার বিকেল নাগাদ তাদের মধ্যে ৩৭ হাজার ৫০০ জন মরক্কোতে ফিরে গেছেন এবং ফেরার এই প্রক্রিয়া অব্যাহত ছিল।

সিউতায় কর্মরত সিভিল গার্ড সদস্যদের প্রতিনিধিত্বকারী শ্রমিক সংগঠনের নেতা রাশিদ সবিহি পরিস্থিতিকে ‘গুরুতর মানবিক সংকট’ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর ভাষ্য, হাজারো মানুষ, যার মধ্যে অনেক অপ্রাপ্তবয়স্কও রয়েছে, পার্ক ও ফুটপাতে রাত কাটাতে বাধ্য হয়েছে। অনেকে খাবার ও আশ্রয় ছাড়াই শহরের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন বলেছেন, সিউতার পরিস্থিতি গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়ম না মেনে সীমান্ত অতিক্রমের সুযোগ দেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে তিনি বিপজ্জনক সমুদ্রপথ বন্ধ করা, মানবপাচারকারী চক্র ভেঙে দেওয়া এবং আইনের আওতায় দ্রুত প্রত্যাবাসনের ওপর জোর দেন।

মরক্কোর অনেক তরুণ জানিয়েছেন, ভালো কাজের আশায় তারা সিউতায় এসেছিলেন। তবে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি ও অনিশ্চয়তার কারণে তারা ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তেতোয়ানের ২১ বছর বয়সী আবদুল্লাহ বুজি বলেন, নিজের দেশে দীর্ঘ সময় কাজ করেও খুব কম আয় হয়। সেই কারণেই তিনি স্পেনে এসেছিলেন। কিন্তু এখানে কোনো সুযোগ না পেয়ে শেষ পর্যন্ত ফিরে যেতে হচ্ছে।

মরক্কোতে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, সীমান্তে অভিবাসীদের ঠেকাতে দেশটির পুলিশ জলকামান ব্যবহার করেছে এবং আকাশে সতর্কতামূলক গুলি ছুড়েছে। তবে স্পেনে নিযুক্ত মরক্কোর রাষ্ট্রদূত করিমা বেনইয়াইচ বলেছেন, সিউতার এই পরিস্থিতি মরক্কোর প্রত্যাশার বিরুদ্ধে ঘটেছে এবং তাঁর দেশ সব সময় বৈধ, নিরাপদ ও নিয়মতান্ত্রিক অভিবাসনকে অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছে।

স্পেনের কর্তৃপক্ষের ধারণা, সাম্প্রতিক এক সুপ্রিম কোর্টের রায়কে ঘিরে বিভ্রান্তিকর প্রচারণাই এই ঢলের অন্যতম কারণ। ওই রায়ে সমুদ্রপথে পৌঁছানো অভিবাসীদের তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত পাঠানো যাবে না বলে উল্লেখ করা হয়। প্রধানমন্ত্রী সানচেজের দাবি, মানবপাচারকারী চক্র এই রায়ের ভুল ব্যাখ্যা ছড়িয়ে হাজারো মানুষকে সীমান্তে আসতে উৎসাহিত করেছে।

ঘটনার জেরে ইউরোপজুড়েও প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ইতালি সাময়িকভাবে স্পেনের সঙ্গে শেনজেন ব্যবস্থার আওতায় সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ পুনর্বহাল করেছে। ফ্রান্সও স্পেন সীমান্তে নজরদারি জোরদারের ঘোষণা দিয়েছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর স্পেনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে এই ঘটনাকে দেশটির সার্বভৌমত্বের গুরুতর লঙ্ঘন বলে মন্তব্য করেছে। অন্যদিকে সানচেজ দাবি করেছেন, তাঁর সরকারের অভিবাসন নীতির সঙ্গে সিউতার এই সংকটের কোনো সম্পর্ক নেই।                       

Advertisement
Advertisement
Advertisement