যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য ওষুধ চুক্তিতে এনএইচএসে মৃত্যুঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা তীব্র
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে স্বাক্ষরিত নতুন ওষুধ-বাণিজ্য চুক্তি ব্রিটেনের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (এনএইচএস)-এর ওপর গুরুতর আর্থিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং এর ফলে আগামী এক দশকে প্রায় ২ লাখ ২৯ হাজার অতিরিক্ত মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নাল (বিএমজে)-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে।
গত ডিসেম্বরে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র আগামী তিন বছর যুক্তরাজ্যের ওষুধ ও চিকিৎসা-প্রযুক্তি পণ্যের ওপর কোনো শুল্ক আরোপ করবে না। এর বিনিময়ে যুক্তরাজ্য সরকার ২০৩৬ সালের মধ্যে নতুন মার্কিন ব্র্যান্ডেড ওষুধ কেনার জন্য এনএইচএসের ব্যয় জিডিপির ০ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে অন্তত ০ দশমিক ৬ শতাংশে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর ফলে এনএইচএসের মোট বাজেটে ওষুধ ব্যয়ের অংশ ১০ শতাংশ থেকে ১২ শতাংশে উন্নীত হবে।
যুক্তরাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে এই চুক্তিকে রোগীদের জন্য নতুন ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধের প্রাপ্যতা বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এর মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের জীবনবিজ্ঞান খাতও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন সুবিধা পাবে।
তবে গবেষণায় বলা হয়েছে, এনএইচএসের মোট বাজেট না বাড়িয়ে ওষুধ খাতে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ দিতে হলে স্বাস্থ্যসেবার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাত থেকে অর্থ সরিয়ে নিতে হবে। স্বাস্থ্য অর্থনীতিতে এটিকে ‘অপর্চুনিটি কস্ট’ বা বিকল্প ব্যয়ের প্রভাব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গবেষকদের মতে, এই অর্থ অন্য খাতে ব্যয় করা হলে আরও বেশি মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হতো।
গবেষণায় পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সরকারি পূর্বাভাস অনুযায়ী এগোলে ২০২৮ সালের মধ্যে এনএইচএসকে প্রতি বছর অতিরিক্ত ১৩০ কোটি পাউন্ড এবং ২০৩৬ সালে ৮৮০ কোটি পাউন্ড ব্যয় করতে হবে। পুরো সময়ে অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ৪৪৭০ কোটি পাউন্ড।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অতিরিক্ত ব্যয়ের ফলে চিকিৎসা ও সামাজিক সেবার অন্যান্য ক্ষেত্রে অর্থের ঘাটতি তৈরি হবে, যার প্রভাবে ২০৩৬ সালের মধ্যে প্রায় ২ লাখ ২৯ হাজার অতিরিক্ত মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে। প্রাপ্তবয়স্কদের সামাজিক সেবার ওপর পরোক্ষ প্রভাবও বিবেচনায় নিলে সম্ভাব্য অতিরিক্ত মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ২ লাখ ৯১ হাজারে পৌঁছাতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণার সহলেখক এবং ইউনিভার্সিটি অব লিভারপুলের ফার্মাকোলজি অ্যান্ড থেরাপিউটিকস বিভাগের অধ্যাপক স্যামুয়েল ক্রস বলেছেন, সীমিত বাজেটের মধ্যে নতুন ওষুধে অতিরিক্ত ব্যয় মানেই স্বাস্থ্যসেবার অন্য কোথাও অর্থ কমে যাওয়া। তাঁর মতে, এই চুক্তির প্রধান সুবিধাভোগী ওষুধ কোম্পানিগুলো হলেও এর মূল্য পরিশোধ করতে হবে এনএইচএসের রোগীদের।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়তে পারে হৃদ্রোগ, শ্বাসতন্ত্র, পরিপাকতন্ত্র ও ক্যানসার চিকিৎসায়। পাশাপাশি স্নায়ুবিক, অন্তঃস্রাবী, অস্থি-পেশি ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবার মানও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে যুক্তরাজ্যের নাগরিক সংগঠন গ্লোবাল জাস্টিস নাউ এই গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে দাবি করেছে, চুক্তির কারণে এনএইচএসের চিকিৎসক ও কর্মী নিয়োগ, হাসপাতালসেবা উন্নয়ন এবং রোগীর অপেক্ষার সময় কমানোর মতো খাতে বরাদ্দ কমে যেতে পারে। অন্যদিকে গবেষকরা সরকারকে এই চুক্তির পূর্ণাঙ্গ প্রভাব মূল্যায়নের প্রতিবেদন প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে বিষয়টি নিয়ে জনপরিসরে স্বচ্ছ আলোচনা সম্ভব হয়।
সূত্র: আলজাজিরা