​বেরোবিতে নাটুকে উপাচার্য বদল: নিয়োগের কয়েক ঘণ্টাতেই ‘অব্যাহতি’, নেপথ্যে কী?

 প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬, ১১:০১ পূর্বাহ্ন   |   রংপুর

​বেরোবিতে নাটুকে উপাচার্য বদল: নিয়োগের কয়েক ঘণ্টাতেই ‘অব্যাহতি’, নেপথ্যে কী?

​নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা ও রংপুর

​রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শীর্ষ পদের শূন্যতা কাটাতে ঘড়ির কাঁটা যখন চার বছরের নতুন মেয়াদের আশা দেখাচ্ছিল, ঠিক তখনই দৃশ্যপটে এলো নাটকীয় পরিবর্তন। নিয়োগের মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর, অনেকটা বিনামেঘে বজ্রপাতের মতোই বাতিল করা হলো নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনিসুর রহমানের নিয়োগ আদেশ। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই নজিরবিহীন ‘ইউ-টার্নে’ একদিকে যেমন প্রশাসনিক অস্থিরতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে জন্ম দিয়েছে গভীর ধোঁয়াশা।

​বৃহস্পতিবার (১৪ মে) দিনভর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে এক অদ্ভুত দোলাচল প্রত্যক্ষ করল দেশ। সকালে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের একটি প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের প্রথিতযশা অধ্যাপক ড. আনিসুর রহমানকে আগামী চার বছরের জন্য বেরোবির উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি ও চ্যান্সেলর। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থবির হয়ে পড়া প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে গতি আসবে—এমন প্রত্যাশায় যখন রংপুরে মিষ্টি বিতরণ আর অভিনন্দন বার্তার জোয়ার বইছিল, তখনই দৃশ্যপট বদলে যায় বিকেলের সূর্য ডোবার আগে।

​সহকারী সচিব মো. সুলতান আহমেদ স্বাক্ষরিত একটি জরুরি প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, ভোরের সেই নিয়োগ আদেশটি বাতিল করা হয়েছে। কেন এই দ্রুত পরিবর্তন? কেন একজন দক্ষ শিক্ষককে নিয়োগ দিয়েও কয়েক ঘণ্টার মাথায় ফিরিয়ে নিতে হলো? এসব প্রশ্নের স্পষ্ট কোনো উত্তর মেলেনি মন্ত্রণালয়ের নথিতে। কেবল জানানো হয়েছে, ‘রাষ্ট্রপতি ও চ্যান্সেলরের অনুমোদনক্রমে’ এই আদেশ জারি করা হলো।

​তবে সচিবালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র ইঙ্গিত দিচ্ছে, এই সংকটের শিকড় অনেক গভীরে। অধ্যাপক আনিসুর রহমানের নাম ঘোষণার পরপরই বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পক্ষ এবং স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের কিছু অভ্যন্তরীণ সমীকরণে অসন্তোষ তৈরি হয়। অভিযোগ উঠেছে, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সমন্বয়হীনতা আর গোয়েন্দা প্রতিবেদনের তথ্যের গরমিল এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। দীর্ঘ দিন অভিভাবকহীন থাকা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন শৃঙ্খলা ফেরানোই ছিল প্রধান চ্যালেঞ্জ, তখন মন্ত্রণালয়ের এমন ‘হঠকারী’ সিদ্ধান্তে সংকটটি কেবল দীর্ঘায়িতই হলো না, বরং প্রশাসনিক কাঠামোকে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিল।

​ক্যাম্পাস সূত্রে জানা গেছে, এই ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর থেকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। সেশনজট নিরসন আর নিয়মিত ক্লাস-পরীক্ষা নিয়ে যে আশার আলো তারা দেখেছিলেন, তা এখন প্রশাসনিক মারপ্যাঁচে বন্দি। এক শিক্ষক নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদ নিয়ে এমন ছেলেখেলা এর আগে দেখা যায়নি। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদাই ক্ষুণ্ণ হয়নি, বরং আমরা এখন আরও দীর্ঘস্থায়ী প্রশাসনিক অচলাবস্থার দিকে এগোচ্ছি।”

​সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত বাড়লেও শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে নতুন কোনো নাম প্রস্তাব করা হয়নি। ফলে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কক্ষটি আজও অন্ধকারই রয়ে গেল। আর এই অন্ধকারের পেছনে লুকানো আছে কোন প্রশাসনিক ব্যর্থতা বা রাজনৈতিক টানাপোড়েন, তা এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।

Advertisement
Advertisement
Advertisement