বদলে যাবে দেশের কৃষি ও প্রকৃতি: পাঁচ বছরে ৭ হাজার কিলোমিটার খাল খননের বিশাল কর্মযজ্ঞ
নিজস্ব প্রতিবেদক, কুড়িগ্রাম | ১০ মে, ২০২৬
তপ্ত রোদে ফেটে যাওয়া ফসলি মাঠ আর নাব্যতা হারানো মরা গাঙের বুক জুড়ে এবার জাগবে প্রাণের স্পন্দন। দেশের কৃষি অর্থনীতিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সরকার হাতে নিয়েছে এক উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সারা দেশের মানচিত্র জুড়ে সাত হাজার কিলোমিটার খাল পুনঃখনন করবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের শুভ সূচনা হলো আজ উত্তরের জনপদ কুড়িগ্রামের মাটি থেকে।
রোববার দুপুরে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার হলোখানা ইউনিয়নের আরাজী পলাশবাড়ী এলাকায় যখন দাসেরহাট ছড়া থেকে এসিল্যান্ড ছড়া পর্যন্ত সংযোগ খাল খনন কাজের উদ্বোধন করা হচ্ছিল, তখন স্থানীয় কৃষকদের চোখেমুখে ছিল আশার ঝিলিক। কোদালের প্রথম কোপ দিয়ে এই মহতী প্রকল্পের উদ্বোধন করেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু। উদ্বোধনী বক্তৃতায় তিনি জানান, কেবল সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনাই নয়, বাস্তবায়নের কাজও শুরু হয়েছে পুরোদমে। চলতি বছরই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার খাল খনন সম্পন্ন করা হবে।
সবুজের সমারোহ ও মৎস্য বিপ্লবের হাতছানি
মন্ত্রী যখন খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের চিত্র আঁকছিলেন, তখন সেখানে উপস্থিত জনতা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনছিলেন এক সবুজ বিপ্লবের গল্প। আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, কুড়িগ্রাম জেলায় প্রাথমিকভাবে চারটি গুরুত্বপূর্ণ খাল চিহ্নিত করা হয়েছে। এই খালগুলো যখন তার পুরনো যৌবন ফিরে পাবে, তখন কৃষকের সেচ সংকটের চিরচেনা হাহাকার ঘুচে যাবে। শুধু কৃষিকাজই নয়, এই খালগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা হবে বহুমুখী অর্থনৈতিক জোন। খালের বদ্ধ ও প্রবাহমান পানিতে হবে মাছের চাষ, আর দুই তীরের ঢালে লাগানো হবে ফলজ ও বনজ বৃক্ষ। এতে যেমন পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা পাবে, তেমনি স্থানীয় মানুষের পুষ্টি ও উপার্জনের নতুন দুয়ার খুলে যাবে।
বজ্রপাত থেকে সুরক্ষা: তৈরি হচ্ছে বিশেষ আশ্রয়কেন্দ্র
সরকারের এই পরিকল্পনা কেবল কৃষি বা বৃক্ষরোপণেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট জীবনঘাতী দুর্যোগ মোকাবিলায়ও এটি এক বড় পদক্ষেপ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উত্তরাঞ্চল ও হাওরাঞ্চলে বজ্রপাতে প্রাণহানির সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। বিষয়টি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে ত্রাণমন্ত্রী এক যুগান্তকারী ঘোষণা দেন। তিনি জানান, বন্যা বা সাইক্লোন সেন্টারের আদলে এখন থেকে দেশে ‘বজ্রপাত আশ্রয়কেন্দ্র’ নির্মাণ করা হবে। বিশেষ করে যেসব খোলা মাঠে কাজ করতে গিয়ে কৃষকরা বজ্রপাতের শিকার হন, সেসব স্থানে বজ্রনিরোধক দণ্ড ও বিশেষায়িত স্থাপনা তৈরি করা হবে। এতে দুর্যোগের মুহূর্তে মানুষের প্রাণহানি কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে সরকার দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা: উত্তরবঙ্গের দীর্ঘশ্বাসের অবসান
কুড়িগ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ও প্রাণের স্পন্দন ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ নিয়ে এদিন স্পষ্ট বার্তা দেন মন্ত্রী। তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যক্তিগতভাবে এই প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করছেন। তিস্তা নদীকে ঘিরে যে মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়ন হলে উত্তরবঙ্গের মরা নদীর পাড়ে আবারও প্রাণের জোয়ার আসবে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কোনো প্রভাব এই উন্নয়ন প্রকল্পে পড়বে না বলেও তিনি নিশ্চয়তা প্রদান করেন।
একযোগে ৬৩ জেলায় চলছে কর্মযজ্ঞ
ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ কেবল কুড়িগ্রাম বা উত্তরাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নেই। পার্বত্য তিন জেলা বাদে দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৬৩টিতেই একযোগে এই খাল খনন ও সংস্কার কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। স্থানীয় সরকার ও প্রশাসনের সমন্বয়ে এই কাজগুলো তদারকি করা হচ্ছে যাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ, জেলা পরিষদ প্রশাসক সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। তারা সবাই একমত পোষণ করেন যে, এই খাল পুনঃখনন কেবল মাটির খনন নয়, বরং এটি বাংলার কৃষকের ভাগ্য পরিবর্তনের নতুন এক অধ্যায়। দুপুরের তপ্ত রোদে যখন উদ্বোধনী ফলক উন্মোচিত হলো, তখন বয়ে যাওয়া বসন্তের ঝিরঝিরে বাতাস যেন জানান দিচ্ছিল—পুরনো খালগুলো আবারও বয়ে নিয়ে আসবে সমৃদ্ধির নতুন স্রোতধারা।