ঠাকুরগাঁওয়ে কোরবানির পশুর উদ্বৃত্ত জোগান: খামারিদের চোখে লাভের স্বপ্ন, মনে খাদ্যের অগ্নিমূল্যের আতঙ্ক
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঠাকুরগাঁও
আসন্ন ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে উত্তরের জনপদ ঠাকুরগাঁওয়ে এখন সাজ সাজ রব। ভোরের আলো ফোটার আগেই খামারিদের ব্যস্ততা শুরু হয় পশুর গোসল আর পরিচর্যা নিয়ে। জেলার পাঁচটি উপজেলার ছোট-বড় সাড়ে চার হাজার খামারে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। তবে পশুর এই বাড়তি জোগানের ভিড়ে খামারিদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে গো-খাদ্যের লাগামহীন দাম। তাদের প্রার্থনা একটাই—সীমান্ত পেরিয়ে যেন না আসে ভারতীয় গরু, তবেই সুফল মিলবে ত্যাগের এই কোরবানির হাটে।
খামারে খামারে ব্যস্ততা
ঠাকুরগাঁওয়ের প্রতিটি জনপদে এখন গরুর ডাক আর খামারিদের কর্মব্যস্ততা। দেশি গরুর পাশাপাশি শাহিওয়াল, সিন্ধি ও ফ্রিজিয়ান জাতের বিশাল সব গরু দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। ক্ষতিকর ইনজেকশন বা স্টেরয়েডের পথে না হেঁটে খামারিরা বেছে নিয়েছেন প্রাকৃতিক পদ্ধতি। খৈল, ভুষি, ঘাস আর খড় খাইয়ে নিবিড় মমতায় বড় করা হয়েছে একেকটি পশুকে।
শিবগঞ্জ এলাকার খামার পরিচালক মো. আব্দুর রাজ্জাক বলছিলেন, "আমরা পশুকে সন্তানের মতো আগলে রাখি। কোনো ভেজাল ছাড়াই প্রাকৃতিক খাবারে গরু হৃষ্টপুষ্ট করা হয়েছে। এখন শুধু ক্রেতাদের আসার অপেক্ষা।"
নতুন বাজারজাতকরণ পদ্ধতি
হাটের ঝক্কি-ঝামেলা এড়াতে ঠাকুরগাঁওয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে খামার থেকে সরাসরি গরু কেনা। সদরের মো. রফিকুল ইসলাম জানান, অনেক ক্রেতা এখনই খামারে এসে ওজন মেপে গরু পছন্দ করছেন। প্রতি কেজি জীবন্ত গরুর মাংস ৪৫০ টাকা দরে বুকিং হচ্ছে অনেক জায়গায়। আবার ক্রেতা-বিক্রেতার দরদামের সনাতনী রীতি তো আছেই। এতে করে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমছে এবং ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েই সন্তুষ্ট থাকছেন।
গো-খাদ্যের দাম ও ভারতীয় গরুর আতঙ্ক
খামারিদের সব আনন্দের মাঝে বিষাদের সুর ঢালছে খাবারের দাম। গমের ভুষি, খৈল এবং ফিশ ফিডের দাম গত এক বছরে কয়েক গুণ বেড়েছে। প্রান্তিক খামারিদের দাবি, পশুপালনের খরচ যেভাবে বেড়েছে, তাতে কাঙ্ক্ষিত দাম না পেলে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসবে।
তাদের সবচেয়ে বড় শঙ্কা সীমান্ত নিয়ে। খামারিদের ভাষ্যমতে, সীমান্ত দিয়ে অবৈধ পথে ভারতীয় গরু প্রবেশ করলে দেশের বাজার পড়ে যাবে। এতে স্থানীয় খামারিরা লোকসানের মুখে পড়বেন, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলবে।
চাহিদার তুলনায় জোগান অনেক বেশি
জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্যমতে, এবার জেলায় কোরবানির পশুর চাহিদা প্রায় ৭২ হাজার। তবে এর বিপরীতে ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিকভাবে প্রায় এক লাখের বেশি পশু প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এই বিপুল উদ্বৃত্ত পশু জেলার বাইরে সরবরাহ করে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জেলা সদরের প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. সাইদুর রহমান বলেন:"গত কয়েক বছর ভারত থেকে গরু না আসায় স্থানীয় খামারিরা অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছেন। তাদের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে এবং স্বাস্থ্যসম্মত পশু পালনে আমরা নিয়মিত পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছি।"
আশার আলো গ্রামীণ অর্থনীতিতে
ঠাকুরগাঁওয়ের খামারিদের চোখে এখন বড় স্বপ্ন। যদি সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায় এবং কৃত্রিম উপায়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ না হয়, তবে এই কোরবানির ঈদই বদলে দেবে হাজারো পরিবারের ভাগ্য। গ্রামীণ জনপদে সঞ্চারিত হবে নতুন প্রাণশক্তি, আর ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল হয়ে উঠবে ঠাকুরগাঁওয়ের পশুর হাটগুলো।