নাফের নীল জলে মুক্তির হাসি: আরাকান আর্মির বন্দিদশা থেকে ফিরলেন ১৪ জেলে

 প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬, ০৯:৪৬ অপরাহ্ন   |   চট্টগ্রাম

নাফের নীল জলে মুক্তির হাসি: আরাকান আর্মির বন্দিদশা থেকে ফিরলেন ১৪ জেলে

​নিজস্ব প্রতিবেদক, টেকনাফ |

বঙ্গোপসাগরের লোনা জল আর নাফ নদীর মোহনায় যাদের জীবন কাটে জাল টেনে, তাদের ঘরে আজ দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হলো। মাঝসমুদ্রে দিক হারিয়ে মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির হাতে বন্দি হওয়া ১৪ জন জেলে অবশেষে ফিরেছেন স্বদেশের মাটিতে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) দীর্ঘ কূটনৈতিক তৎপরতা ও মানবিক প্রচেষ্টায় শনিবার (৯ মে) বিকেলে নাফ নদীর শূন্যরেখায় তাদের হস্তান্তর করা হয়।

​রুদ্ধশ্বাস সেই বন্দিজীবন

​২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের বিভিন্ন সময়ে জীবিকার তাগিদে সাগরে ভাসিয়েছিলেন নৌকাগুলো। কিন্তু উত্তাল সমুদ্র আর প্রতিকূল আবহাওয়ায় অনিচ্ছাকৃতভাবেই তারা অতিক্রম করেছিলেন বাংলাদেশের জলসীমা। সেই অসতর্ক মুহূর্তই কাল হয়ে দাঁড়ায়। মিয়ানমারের জলসীমায় প্রবেশের পরপরই আরাকান আর্মির সদস্যরা তাদের আটক করে নিয়ে যায় দুর্গম পাহাড়ি এলাকার গোপন ক্যাম্পে।

​বন্দি এই ১৪ জনের মধ্যে ১৩ জন বাংলাদেশি এবং একজন রোহিঙ্গা যুবক ছিলেন। দীর্ঘ কয়েকমাস বিদেশের মাটিতে অনিশ্চয়তায় দিন কেটেছে তাদের। পরিবারের কাছে তারা ছিলেন ‘নিখোঁজ’। একেকটি দিন কাটত বিজিবি আর সরকারের দিকে চাতক পাখির মতো চেয়ে থেকে।

​বিজিবির মানবিক কূটনীতি

​বন্দি জেলেদের উদ্ধারে গত কয়েক মাস ধরে নেপথ্যে কাজ করেছে বিজিবির ২ ব্যাটালিয়ন। কক্সবাজার রিজিয়নের বিজিবির পক্ষ থেকে আরাকান আর্মির সঙ্গে ধাপে ধাপে যোগাযোগ স্থাপন করা হয়। এটি কোনো সাধারণ উদ্ধার অভিযান ছিল না; ছিল এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক ও মানবিক সমন্বয়।

​বিজিবির ২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. হানিফুর রহমান ভূঁইয়া জানান:​“সীমান্ত সুরক্ষা আমাদের প্রধান দায়িত্ব হলেও, বিজিবি সর্বদা জনগণের জানমালের নিরাপত্তায় অঙ্গীকারবদ্ধ। মানবিক সংকট বিবেচনায় নিয়ে আমরা কার্যকর যোগাযোগ রক্ষা করেছি। আমাদের নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা ও সমন্বিত উদ্যোগের ফলেই আজ এই ১৪ জন প্রাণ ফিরে পেলেন।”

​ফিরে আসার সেই মুহূর্ত

​শনিবার নাফ নদীর বুকে যখন বিজিবির টহল বোটগুলো শূন্যরেখার দিকে এগোচ্ছিল, তখন জেলেদের চোখেমুখে ছিল কান্নার আড়ালে লুকানো এক চিলতে হাসি। ওপারে বন্দিশালা, এপারে চিরচেনা মাতৃভূমি। হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শেষ করে যখন তাদের বাংলাদেশের সীমানায় নিয়ে আসা হয়, তখন অনেক জেলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন।

​বর্তমানে স্থানীয় উপজেলা প্রতিনিধি ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে তাদের পরিচয় নিশ্চিতকরণের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া চলছে। বিজিবি জানিয়েছে, দাপ্তরিক কাজ শেষে দ্রুতই তাদের স্বজনদের উষ্ণ আলিঙ্গনে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।

​সীমান্ত জনপদে স্বস্তি

​টেকনাফ ও উখিয়ার উপকূলীয় গ্রামগুলোতে এই খবর পৌঁছানোর পর উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। নিদারুণ অভাব আর প্রিয়জনের ফেরার প্রতীক্ষায় থাকা পরিবারগুলোর কাছে এটি ঈদের আনন্দের চেয়েও বেশি কিছু।

​বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরীণ সংকটের মাঝেও বিজিবির এমন সফল মধ্যস্থতা দুই দেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করল। বিজিবি অধিনায়ক প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন যে, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি এ ধরনের মানবিক কার্যক্রম ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।

​একনজরে উদ্ধার হওয়া জেলেদের তথ্য:

মোট উদ্ধার: ১৪ জন (১৩ বাংলাদেশি, ১ রোহিঙ্গা)।​আটকের কারণ: অনিচ্ছাকৃত জলসীমা লঙ্ঘন।​উদ্ধারকারী সংস্থা: ২ ব্যাটালিয়ন বিজিবি, টেকনাফ।​হস্তান্তর স্থান: নাফ নদী শূন্যরেখা।

Advertisement
Advertisement
Advertisement