​আমানতের হাহাকারে উত্তাল আগ্রাবাদ: পাঁচ ব্যাংকে গ্রাহকদের তালা, দিশেহারা ব্যাংক কর্মকর্তারা

 প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬, ০৩:৪০ অপরাহ্ন   |   চট্টগ্রাম

​আমানতের হাহাকারে উত্তাল আগ্রাবাদ: পাঁচ ব্যাংকে গ্রাহকদের তালা, দিশেহারা ব্যাংক কর্মকর্তারা

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম 

বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক হৃদপিণ্ড হিসেবে পরিচিত আগ্রাবাদ এলাকা আজ এক ভিন্ন রূপ দেখল। প্রতিদিন যেখানে শত শত কোটি টাকার লেনদেন চলে, সেখানে আজ কেবল ধ্বনিত হয়েছে আমানত হারানো মানুষের আর্তনাদ আর ক্ষোভ। কয়েকশ ভুক্তভোগী আমানতকারী রাস্তায় নেমে এসেছেন তাদের তিল তিল করে জমানো টাকা ফিরে পাওয়ার দাবিতে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকের প্রধান শাখাগুলোতে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন বিক্ষুব্ধ গ্রাহকরা।

​সোমবার (৪ মে) সকাল ১১টার দিকে এক থমথমে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় আগ্রাবাদের বাদামতলী মোড়ে। ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক আমানতকারী অ্যাসোসিয়েশন’-এর ব্যানারে জড়ো হন শত শত নারী-পুরুষ। তাদের হাতে ছিল প্ল্যাকার্ড, আর মুখে ছিল অধিকার আদায়ের স্লোগান। মিছিলটি যখন আগ্রাবাদের মূল সড়ক প্রদক্ষিণ করছিল, তখন আশপাশের ব্যবসায়ীদের মধ্যেও এক ধরনের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

​বিক্ষোভকারীরা মিছিল নিয়ে প্রথমেই হানা দেন এক্সিম ব্যাংকে। সেখানে ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার পর তাদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল ইউনিয়ন ব্যাংক এবং ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। একে একে পাঁচটি ব্যাংকের শাখায় তালা ঝুলিয়ে গ্রাহকরা জানান দেন, তাদের পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকে গেছে। উল্লেখ্য, সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে সম্প্রতি ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংককে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ নাম দেওয়া হয়েছে।

​আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল একটি শব্দ— ‘হেয়ার কাট’। আমানতকারীরা ক্ষোভের সাথে বলছিলেন, "আমরা আমাদের কষ্টের টাকা জমা রেখেছি, কেন আমাদের লভ্যাংশ বা মূল টাকা কাটছাঁট করা হবে? কেন আমাদের টাকা ফেরত দিতে টালবাহানা করা হচ্ছে?" বিক্ষোভের মিছিলে থাকা ষাটোর্ধ্ব এক বৃদ্ধকে দেখা গেল ব্যাংকের বন্ধ ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে বলতে, "মেয়ের বিয়ের জন্য জমানো টাকাগুলো কি তবে ডুবে গেল?"

​এদিকে ব্যাংকের ভেতরে আটকা পড়া কর্মকর্তারাও ছিলেন চরম বিব্রতকর অবস্থায়। ইউনিয়ন ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার ব্যবস্থাপক কায়সারুল আলম গণমাধ্যমকে নিজের অসহায়ত্বের কথা জানান। তিনি বলেন, “সব গ্রাহক যদি একসাথে টাকা তুলতে আসেন, তবে কোনো ব্যাংকের পক্ষেই তা সামলানো সম্ভব নয়। আমরা আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত আপডেট দিচ্ছি। আন্দোলন চলায় আমাদের দৈনন্দিন স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।”

​আন্দোলনকারীদের দাবি, তারা হুট করে এই কর্মসূচি নেননি। এর আগে নিয়ম অনুযায়ী সরকারের বিভিন্ন দফতরে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে, দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন ব্যাংক কর্তৃপক্ষের। কিন্তু কোনো পক্ষ থেকেই সুনির্দিষ্ট আশ্বাসের বাতিঘর তারা দেখতে পাননি। এর আগে গত রবিবার খাতুনগঞ্জেও একই ধরনের বিক্ষোভ হয়েছে, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এই অসন্তোষ কেবল আগ্রাবাদে সীমাবদ্ধ নেই।

​বিক্ষোভ সমাবেশের শেষে আমানতকারীরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি অতিদ্রুত তাদের জমানো টাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না হয় এবং লেনদেন স্বাভাবিক না হয়, তবে চট্টগ্রামের প্রতিটি শাখা অচল করে দেওয়া হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে আগ্রাবাদ এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে, তবে সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাসের কাছে নিরাপত্তার সেই আয়োজন যেন বড্ড ফিকে হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement