সংবাদ শিরোনাম

কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধ, বিপাকে রপ্তানিকারক-শ্রমিক-কৃষক

 প্রকাশ: ১৭ অগাস্ট ২০২৬, ০৬:৪৬ অপরাহ্ন   |   খুলনা

কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধ, বিপাকে রপ্তানিকারক-শ্রমিক-কৃষক

মাসুদ আল হাসান, খুলনা :

দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পর প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ কাঁচা পাট উদ্বৃত্ত থাকে। সেই পাটের একটি অংশ রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে আসছিলেন ব্যবসায়ীরা। এ খাতের সঙ্গে জড়িত শতাধিক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান, প্রায় ৪০টি জুট প্রেস, আড়ত, পরিবহনব্যবস্থা ও বিপুলসংখ্যক শ্রমিক। কিন্তু প্রায় এক বছর ধরে কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধ থাকায় পুরো খাতটিই বড় ধরনের সংকটে পড়েছে।

ব্যবসায়ীদের দাবি, কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধ হওয়ায় একদিকে যেমন রপ্তানিকারকেরা লোকসানে পড়েছেন, অন্যদিকে জুট প্রেস ও আড়তকেন্দ্রিক কর্মসংস্থান কমেছে। কর্মহীন হয়ে পড়েছেন বিপুলসংখ্যক শ্রমিক। একই সঙ্গে উৎপাদিত পাটের ন্যায্য দাম পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন কৃষকেরাও।

বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশন (বিজেএ) বলছে, দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পর প্রতিবছর ১৫ থেকে ২০ লাখ বেল কাঁচা পাট উদ্বৃত্ত থাকে। এর মধ্যে ৮ থেকে ১২ লাখ বেল রপ্তানি করা সম্ভব। এভাবে প্রতিবছর প্রায় ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যায়।

২০২৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কাঁচা পাটকে শর্তযুক্ত রপ্তানি পণ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এরপর থেকেই কার্যত কাঁচা পাটের রপ্তানি বন্ধ রয়েছে।

কাঁচা পাট রপ্তানিকারকদের প্রশ্ন, দীর্ঘদিনের একটি রপ্তানি খাত কোনো ধরনের বিকল্প ব্যবস্থা না রেখে কেন বন্ধ করা হলো? বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান খন্দকার আলমগীর কবিরও এর কারণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

তিনি বলেন, ‘শত বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে পাট রপ্তানি চলছে। হঠাৎ করে কেন এটা বন্ধ করা হলো, আমার জানা নেই।’

বিজেএ চেয়ারম্যানের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর কাঁচা পাটের চাহিদা ৫৫ থেকে ৬০ লাখ বেল। সেই চাহিদা পূরণের পরও ১৫ থেকে ২০ লাখ বেল পাট উদ্বৃত্ত থাকে। এর একটি অংশ রপ্তানি করে বছরে ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।

কাঁচা পাট রপ্তানি শুধু রপ্তানিকারকদের ব্যবসা নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বড় একটি কর্মসংস্থানব্যবস্থা। পাট সংগ্রহ, আড়তদারি, বাছাই, জুট প্রেসে চাপ দেওয়া ও বেল তৈরি, পরিবহন এবং রপ্তানির বিভিন্ন ধাপে কাজ করেন বিপুলসংখ্যক শ্রমিক।

বিজেএর তথ্য অনুযায়ী, কাঁচা পাট রপ্তানির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লক্ষাধিক শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারী যুক্ত। সংগঠনটির চেয়ারম্যানের দাবি, ৭০ থেকে ৮০টি কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে সংকটে আছেন।

দৌলতপুর জুট প্রেস অ্যান্ড বেলিং ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন (১১৫৫)-এর সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম মিঠুও কাঁচা পাটের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর মতে, রপ্তানি বন্ধ থাকায় জুট প্রেসকেন্দ্রিক শ্রমিকদের কাজ কমেছে এবং অনেকেই কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।

কাঁচা পাটের রপ্তানি বন্ধের প্রভাব শুধু রপ্তানিকারক বা শ্রমিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ব্যবসায়ীদের যুক্তি, বিদেশে বিক্রির সুযোগ কমে গেলে বাজারে পাটের চাহিদাও কমে যায়। এতে কৃষকেরা উৎপাদিত পাটের প্রত্যাশিত দাম থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন।

পাটের মৌসুমে কৃষকের কাছ থেকে আড়তদার ও ব্যবসায়ীরা পাট সংগ্রহ করেন। পরে তা জুট প্রেসের মাধ্যমে বেল তৈরি করে রপ্তানি করা হয়। রপ্তানি কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়লে এই সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরেই চাপ তৈরি হয়।

অর্থাৎ, রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার প্রভাব এক জায়গায় আটকে নেই; কৃষকের মাঠ থেকে শুরু করে আড়ত, জুট প্রেস, পরিবহন ও রপ্তানিকারক—পুরো শৃঙ্খলেই এর প্রভাব পড়ছে।

বিজেএ চেয়ারম্যানের অভিযোগ, কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধ করে ১০ শতাংশ প্রণোদনার মাধ্যমে জুট স্লিভার রপ্তানির সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এতে সরকারের বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে।

তাঁর দাবি, দেশের চাহিদা মেটানোর পর উদ্বৃত্ত কাঁচা পাট সরাসরি রপ্তানির সুযোগ থাকলে সরকারকে আলাদা করে প্রণোদনা দিতে হয় না। ফলে কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধ রেখে প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানিতে প্রণোদনা দেওয়ার নীতির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধ রাখার কারণ এবং এই নীতির অর্থনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা জানা গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।

কাঁচা পাটের রপ্তানি পুনরায় চালুর দাবিতে গত ১৩ আগস্ট বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর কাছে লিখিত আবেদন করেছেন বিজেএ চেয়ারম্যান খন্দকার আলমগীর কবির।

আবেদনে তিনি কাঁচা পাটকে শর্তযুক্ত রপ্তানি পণ্যের তালিকা থেকে প্রত্যাহার এবং রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবি জানান। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, এই খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারী যুক্ত রয়েছেন।

ব্যবসায়ীদের মতে, পাট বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী রপ্তানি পণ্য। শত বছর ধরে কাঁচা পাট রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়ে আসছে। তাই রপ্তানি বন্ধ রাখার পরিবর্তে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা নিশ্চিত করে উদ্বৃত্ত পাট রপ্তানির সুযোগ দেওয়া হলে কৃষক, শ্রমিক ও ব্যবসায়ী—তিন পক্ষই উপকৃত হতে পারেন।

এখন প্রশ্ন হলো, দেশের চাহিদা মেটানোর পর যে পাট উদ্বৃত্ত থাকে, সেটি রপ্তানির পথ বন্ধ রাখার অর্থনৈতিক যুক্তি কী? আর প্রায় এক বছর ধরে বন্ধ থাকা এই খাত আবার চালু হলে কতটা কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা ফিরিয়ে আনা সম্ভব—সেটিই এখন সংশ্লিষ্টদের কাছে বড় প্রশ্ন।#