মিরাজকে আটক বা হেফাজতে নেওয়ার তথ্য-প্রমাণ পায়নি কোস্ট গার্ড
খুলনা ব্যুরো:
বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার জয়মনির ঘোল এলাকার বাসিন্দা নিখোঁজ মিরাজ শেখকে আটক বা হেফাজতে নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। বাহিনীটির দাবি, অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধান, অপারেশনাল রেকর্ড, টহল কার্যক্রম ও দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যদের তথ্য পর্যালোচনা করে মিরাজ শেখকে আটক, জিজ্ঞাসাবাদ বা হেফাজতে নেওয়ার কোনো তথ্য বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন এ তথ্য জানান।
কোস্ট গার্ডের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মিরাজ শেখ ১৯৯৬ সালের ৩ অক্টোবর মোংলার জয়মনির ঘোল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। স্থানীয়ভাবে তিনি জেলে ও মোটরসাইকেলচালক হিসেবে পরিচিত।
বাহিনীটির দাবি, স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী তিনি সুন্দরবনের বনদস্যু ছোট সুমন বাহিনীর অন্যতম লজিস্টিকস সরবরাহকারী ছিলেন। একই সঙ্গে মাদকসেবনের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অতীতেও তিনি দীর্ঘ সময় পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রেখে সুন্দরবন এলাকায় অবস্থান করতেন বলে দাবি করেছে কোস্ট গার্ড।
বাহিনীটির ভাষ্য, ছোট সুমন বাহিনীর হয়ে জেলেদের কাছ থেকে মুক্তিপণ ও চাঁদা বাবদ আদায় করা প্রায় ছয় লাখ টাকা নিজের কাছে রেখে দেওয়াকে কেন্দ্র করে মিরাজের সঙ্গে ওই বাহিনীর বিরোধ সৃষ্টি হয়।
কোস্ট গার্ড আরও জানায়, মিরাজের বাবা মোস্তফা শেখ একসময় সুন্দরবনের জুলফিকার বাহিনীর সক্রিয় সদস্য ছিলেন।
২০১৬ সালের ৩১ মে তিনি বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন। মিরাজ শেখের বিরুদ্ধে বর্তমানে তিনটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে দুটি মামলায় তিনি গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত আসামি বলে দাবি করেছে কোস্ট গার্ড।
তার কয়েকজন আত্মীয়ের বিরুদ্ধেও ডাকাতি, চাঁদাবাজি ও চুরির মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে বাহিনীটি।
মিরাজকে কোস্ট গার্ড তুলে নিয়ে গেছে—পরিবারের এমন অভিযোগের বিষয়ে বাহিনীটি বলেছে, ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল জয়মনির ঘোল এলাকায় কোস্ট গার্ডের কোনো অভিযান পরিচালিত হয়নি। ওই দিন হারবারিয়া ইকোট্যুরিজম এলাকায় নিয়মিত টহল কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছিল।
১০ এপ্রিল মিরাজ নিখোঁজ হওয়ার দাবি করা হলেও ২৩ এপ্রিল মোংলা থানায় করা সাধারণ ডায়েরিতে কোস্ট গার্ডসহ কোনো ব্যক্তি বা সংস্থার বিরুদ্ধে অপহরণের অভিযোগ করা হয়নি বলেও দাবি করেছে তারা।
কোস্ট গার্ডের দাবি, পরবর্তীতে ৮ মে ও ২৬ মে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে ঘটনাস্থল, পরিচয়, পোশাক ও ঘটনার বর্ণনায় একাধিক অসঙ্গতি পাওয়া যায়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের বরাত দিয়ে বাহিনীটি আরও দাবি করেছে, তারা কোস্ট গার্ডকে কখনো সাদা পোশাকে অভিযান পরিচালনা করতে দেখেননি। বাহিনীর বিরুদ্ধে আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের কোনো প্রত্যক্ষদর্শীও পাওয়া যায়নি বলে দাবি করা হয়েছে।
এদিকে, গত ১১ জুন হারবারিয়া কোস্ট গার্ড স্টেশনের পন্টুনে হামলার ঘটনায় বনদস্যু ও তাদের সহযোগী, মিরাজ শেখের পরিবারের সদস্য এবং স্থানীয় কয়েকজনকে দায়ী করেছে কোস্ট গার্ড। তাদের দাবি, হামলায় সরকারি সম্পদের প্রায় ২ কোটি ৩৯ লাখ ৮০ হাজার টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ধারণকৃত ভিডিও ফুটেজের ভিত্তিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে বাহিনীটি।
সুন্দরবনের নিরাপত্তা কার্যক্রম সম্পর্কে কোস্ট গার্ড জানায়, ‘অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন’ ও ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’-এর মাধ্যমে ৪৫ জন বনদস্যুকে অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ আটক এবং বনদস্যুদের জিম্মিদশা থেকে ৪২ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
ধারাবাহিক অভিযানের ফলে ছোট সুমন বাহিনী, বড় জাহাঙ্গীর বাহিনী ও ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনীর সদস্যসহ ৩৭ জন বনদস্যু আত্মসমর্পণ করেছেন বলেও দাবি করেছে বাহিনীটি।
কোস্ট গার্ডের অভিযোগ, একটি স্বার্থান্বেষী মহল ও কয়েকজন ব্যক্তি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বাহিনীটির বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানোর চেষ্টা করছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
মিরাজ শেখের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় পরিবারের অভিযোগ এবং কোস্ট গার্ডের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী। ফলে ঘটনাটির প্রকৃত কারণ উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।