কাঁটাতারের খাঁচায় বন্দি মানবতা: বেনাপোল সীমান্তে পুশইনের মুখে একদল অভুক্ত মানুষ
বেনাপোল (যশোর), প্রতিবেদক :
তপ্ত রোদ, মাথার ওপর খাঁ খাঁ করছে নীল আকাশ, আর পায়ের নিচে তপ্ত বালুচর। ভারতীয় সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ার ঠিক বাইরে, বাংলাদেশের সীমানার গা ঘেঁষে খোলা মাঠের মধ্যে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছেন ১০-১২ জন নারী, পুরুষ ও শিশু। দুই দিন ধরে প্লাস্টিকের চট আর সামান্য কাপড়ের পুঁটুলি সম্বল করে খোলা আকাশের নিচে দিন কাটছে তাদের। প্রখর রোদের তাপে তৃষ্ণায় বুক ফেটে যাচ্ছে শিশুদের, অথচ এক ফোঁটা পানি বা দানাদার খাবার জোগাড় করার কোনো উপায় নেই। দূর থেকে দেখলে মনে হবে তারা যেন কোনো এক আদিম বন্দিশালায় আটকে পড়া অভাগা দল। মূলত, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার (পুশইন) অপচেষ্টা এবং বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিবি) কঠোর পাহারার মাঝখানে পড়ে সীমান্তের ‘শূন্যরেখায়’ এখন এক চরম মানবিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত সোমবার গভীর রাতে। সীমান্তের বাসিন্দারা জানান, রাতের আঁধারে বেনাপোলের সাদিপুর সীমান্ত এলাকা দিয়ে এক দল মানুষকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে প্রবেশ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালায় বিএসএফ। সীমান্তের নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠাতই কিছু মানুষের ফিসফাস শব্দ আর কান্নার আওয়াজ পেয়ে সতর্ক হয়ে ওঠেন টহলরত বিজিবি সদস্যরা। বিজিবির তাত্ক্ষণিক ও কঠোর প্রতিরোধের মুখে বিএসএফের সেই রাতের বেলার পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। প্রথম দফায় ব্যর্থ হয়ে বিএসএফ ওই অসহায় মানুষগুলোকে ভারতের প্রায় ১৫০ গজ অভ্যন্তরে কাঁটাতারের বেড়ার বাংলাদেশ প্রান্তের কাছাকাছি একটি খোলা মাঠে আটকে রাখে। এরপর গত দুই দিন ধরে দফায় দফায় তাদের বাংলাদেশে পুশইন করার চেষ্টা চালানো হলেও বিজিবির অনড় অবস্থানের কারণে তা সম্ভব হয়নি।
বর্তমানে সীমান্তবর্তী সাদিপুর ও রঘুনাথপুর এলাকায় এক থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। দূর-দূরান্ত থেকে উত্সুক মানুষ ভিড় জমিয়েছেন সীমান্তের কাঁটাতারের কাছাকাছি এলাকায়। সীমান্তবাসী জানান, খোলা মাঠে আটকে থাকা মানুষগুলো প্রচণ্ড গরম, পানির সংকট ও খাদ্যাভাবে ধুঁকছেন। ক্ষুধার জ্বালায় এবং পিপাসায় কাতর হয়ে তারা কয়েক বার দিকবিদিক জ্ঞান হারিয়ে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রবেশের চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সীমান্তে মোতায়েন থাকা বিজিবি সদস্যদের আইনি বাধার মুখে চোখের পানি ফেলতে ফেলতে আবার সেই তপ্ত মাঠেই ফিরে যেতে বাধ্য হন। অমানবিক এই দৃশ্য দেখে সীমান্তের সাধারণ মানুষের মধ্যেও এক ধরনের সহানুভূতি ও চাপা ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
এই অনাকাঙ্ক্ষিত উদ্ভূত পরিস্থিতির পরপরই বিজিবির পক্ষ থেকে বিএসএফের সঙ্গে তাত্ক্ষণিক যোগাযোগ করা হয়েছে। রাতের আঁধারে এভাবে পুশইনের চেষ্টা চালানোর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ঘটনার আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দাবি করেছে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ। তবে বিজিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সীমান্তে আটকে রাখা এই অভাগা মানুষগুলো আদতে কোন দেশের নাগরিক—তারা বাংলাদেশি নাকি ভারতীয়—সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পরিচয় নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকেই বাংলাদেশের ভূখণ্ডে পা রাখতে দেওয়া হবে না বলে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিজিবি সদস্যরা সীমান্ত এলাকায় সার্বক্ষণিক কড়া নজরদারি ও টহল জোরদার করেছেন।
পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে গতকাল মঙ্গলবার বেলা ২টার দিকে বিজিবির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় রিজিয়নের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহমুদুল হাসান স্বশরীরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি সীমান্তের সম্মুখভাগে নিয়োজিত বিজিবি সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকার নির্দেশ দেন। পরিদর্শন শেষে তিনি সাংবাদিকদের জানান, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধে বিজিবি জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। সীমান্তে যাতে কোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ বা পুশইনের ঘটনা না ঘটতে পারে, সে বিষয়ে সীমান্তরক্ষী বাহিনী দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থেকে দায়িত্ব পালন করছে। দেশের সীমান্ত সুরক্ষায় কোনো ধরনের আপস করা হবে না বলেও তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, শূন্যরেখায় আটকে থাকা পরিবারগুলোর ভাগ্য এখনো ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে এবং সীমান্ত জুড়ে বিজিবির হাই-অ্যালার্ট জারি রয়েছে।