খানজাহানের দিঘিতে এবার কুমিরের মুখে শিশু: রাতের অন্ধকারেও চলছে উদ্ধার অভিযান

 প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬, ১১:১৫ পূর্বাহ্ন   |   খুলনা

খানজাহানের দিঘিতে এবার কুমিরের মুখে শিশু: রাতের অন্ধকারেও চলছে উদ্ধার অভিযান

বাগেরহাট প্রতিনিধি :

​ঐতিহাসিক ও লোকগাথার চাদরে মোড়ানো বাগেরহাটের খান জাহান আলী (র.) মাজার সংলগ্ন দিঘি যেন মুহূর্তেই রূপ নিল এক বিভীষিকাময় ট্র্যাজেডিতে। চিরচেনা শান্ত দিঘির জল কেটে হঠাৎ এক হিংস্র থাবায় হারিয়ে গেল সাত বছরের শিশু ফাতেমা আক্তার। সোমবার রাত আটটার দিকে মাজারের প্রধান ঘাটে যখন এই রোমহর্ষক ঘটনা ঘটে, তখন পুরো এলাকায় নেমে আসে স্তব্ধতা। এরপরই শুরু হয় নিখোঁজ শিশুটিকে উদ্ধারে এক রুদ্ধশ্বাস ও সম্মিলিত লড়াই, যা গভীর রাত পর্যন্ত বজায় থাকলেও ফাতেমার কোনো হদিস মেলাতে পারেনি।

​মাজার কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা গেছে, এক মানসিক প্রতিবন্ধী নারী তার শিশুকন্যা ফাতেমাকে সাথে নিয়ে রাতে দিঘির ঘাটে গোসল করতে নেমেছিলেন। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে জলরাশিতে যখন তারা নেমেছেন, ঠিক তখনই অন্ধকার পানির নিচে ওত পেতে থাকা বিশাল এক কুমির অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে শিশুটির ওপর। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ধারালো দাঁতের মরণ কামড়ে ফাতেমাকে আঁকড়ে ধরে পানির গভীরে টেনে নিয়ে যায় জলচর এই প্রাণীটি। মায়ের চোখের সামনে কোলের সন্তানকে টেনে নিয়ে যাওয়ার সময় শিশুটির বুকফাটা আর্তচিৎকারে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে মাজার এলাকা।

​চিৎকার শুনে আশপাশে থাকা স্থানীয় বাসিন্দা, দর্শনার্থী ও মাজারের খাদেমরা লাঠিসোটা ও লণ্ঠন নিয়ে ছুটে আসেন। কয়েকজন সাহসী যুবক তৎক্ষণাৎ ঘাটে থাকা নৌকা নিয়ে দিঘির বুকে নেমে পড়েন। তারা চারপাশ থেকে পানিতে ইট-পাটকেল ও লাঠি ছুড়ে কুমিরটিকে ভয় দেখিয়ে শিশুটিকে ছাড়িয়ে আনার আপ্রাণ চেষ্টা চালান। কিন্তু গভীর পানির অন্ধকার আর কুমিরের প্রচণ্ড গতির কাছে সেই প্রাথমিক প্রতিরোধ ব্যর্থ হয়। চোখের পলকেই ফাতেমাকে নিয়ে দিঘির অতল গভীরে মিলিয়ে যায় কুমিরটি।

​খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উদ্ধারকারী দল এবং বাগেরহাট সদর থানা পুলিশ। বাতি জ্বালিয়ে, জাল ফেলে এবং স্পিডবোট নিয়ে দিঘির প্রতিটি কোণায় তল্লাশি শুরু হয়। রাত সাড়ে ১১টা পার হয়ে গেলেও উদ্ধারকারীরা ফাতেমার কোনো সন্ধান পাননি। দিঘির পাড়ে তখন শত শত মানুষের ভিড়, যেখানে নিখোঁজ শিশুর স্বজনদের আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে উঠছিল।

​হৃদয়বিদারক এই ঘটনার খবর পেয়ে মধ্যরাতেই ঘটনাস্থল পরিদর্শনে ছোটেন বাগেরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মনজুরুল হক রাহাদ, জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন এবং পুলিশ সুপার হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদারসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তারা উদ্ধার তৎপরতা নিজে দাঁড়িয়ে তদারকি করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সান্ত্বনা জানান। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে ও উদ্ধারকাজ নির্বিঘ্ন করতে মাজার এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

​ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাংবাদিকদের জেলা প্রশাসক গোলাম মোহাম্মদ বাতেন বলেন, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও স্থানীয়দের সমন্বয়ে সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হচ্ছে। প্রশাসন সার্বিক পরিস্থিতি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তিনি অতীতে ঘটে যাওয়া এক ঘটনার স্মৃতিচারণ করে বলেন, এর আগেও এই দিঘিতে কুমিরের আক্রমণে একটি কুকুরের মৃত্যু হয়েছিল। কিন্তু এবার সরাসরি মানুষের ওপর, তাও একটি নিষ্পাপ শিশুর ওপর এই আক্রমণ অত্যন্ত উদ্বেগের।

​জেলা প্রশাসক আরও ইঙ্গিত দেন যে, শত বছরের ঐতিহ্যবাহী এই দিঘিতে কুমির রাখার চেনা নিয়মে এবার হয়তো বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। তিনি দৃঢ়তার সাথে জানান, ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, তবে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা ও মূল্য তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি। এই মর্মান্তিক ঘটনার পর স্থানীয় সংসদ সদস্য, মাজার কর্তৃপক্ষ এবং খাদেমদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করা হবে এবং দিঘিতে আর কুমির রাখা হবে কি না, কিংবা রাখলেও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত ও স্থায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। গভীর রাতে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত দিঘির বুক চিরে ফাতেমাকে খুঁজে বেড়ানোর আকুল চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন উদ্ধারকর্মীরা।

Advertisement
Advertisement
Advertisement