সুন্দরবনে দস্যু আতঙ্ক: ১৩ দিন জিম্মি থাকার পর মুক্তিপণে ফিরলেন ছয় জেলে, নীরব চাঁদাবাজিতে বিপর্যস্ত উপকূলবাসী

 প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৬, ১২:৪৯ অপরাহ্ন   |   খুলনা

সুন্দরবনে দস্যু আতঙ্ক: ১৩ দিন জিম্মি থাকার পর মুক্তিপণে ফিরলেন ছয় জেলে, নীরব চাঁদাবাজিতে বিপর্যস্ত উপকূলবাসী

ডেক্স নিউজ:

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জীববৈচিত্র্যের আধার সুন্দরবন—যেখানে প্রকৃতির সৌন্দর্যের পাশাপাশি লুকিয়ে থাকে ভয়াবহ অনিশ্চয়তা—সেখান থেকেই ফিরে এলেন ছয় জেলে, ১৩ দিনের দুঃসহ বন্দিজীবন কাটিয়ে।

গত ২০ এপ্রিল, বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার পূর্ব সুন্দরবনের কোকিলমনি ও চাতরা এলাকায় মাছ ধরতে গিয়ে তারা অপহরণের শিকার হন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বনদস্যু করিম শরীফ ও নানাভাই বাহিনীর সদস্যরা তাদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে গভীর বনের অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়।

জিম্মি থাকা সেই দিনগুলো ছিল অনিশ্চয়তা, ভয় আর পরিবারের জন্য অপেক্ষার এক দীর্ঘ পরীক্ষা। বাড়িতে থাকা স্বজনদের প্রতিটি দিন কেটেছে আতঙ্কে। অবশেষে মুক্তিপণের টাকা পরিশোধের মাধ্যমে শনিবার (২ মে) সকালে তারা ফিরে আসেন নিজ নিজ বাড়িতে—ক্লান্ত, আতঙ্কিত, কিন্তু জীবিত।

জেলে কালাম ফরাজীর স্ত্রী নাজমা বেগম জানান, “প্রতিদিন মনে হতো, হয়তো আর ফিরবে না। শেষ পর্যন্ত মহাজন টাকা দিয়ে তাদের ফিরিয়ে আনলেন।”

ফিরে আসা অন্য জেলেরা—আনোয়ার বয়াতি, কবিরুল, মহসিন ও আ. সালাম—এখনও সেই বিভীষিকার স্মৃতি ভুলতে পারেননি। তারা জানিয়েছেন, জিম্মিদশায় তাদের অমানবিক অবস্থায় রাখা হয় এবং মুক্তিপণের চাপ বাড়াতে নানা ধরনের ভয়ভীতি দেখানো হয়।

স্থানীয় এক মৎস্য ব্যবসায়ী, যিনি নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশ করতে চাননি, বলেন—“এখন সুন্দরবনে প্রকাশ্যে নয়, নীরবে চাঁদাবাজি চলছে। জেলে আর মৌয়ালরা কাজ করতে গেলেই ভয় নিয়ে যেতে হয়। কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না।”

তার দাবি, এখনও অন্তত সাত থেকে আটজন জেলে ও মৌয়াল বিভিন্ন দস্যু বাহিনীর কাছে জিম্মি অবস্থায় রয়েছেন।

অন্যদিকে, এ বিষয়ে জানতে চাইলে শরণখোলা থানার অফিসার ইনচার্জ মো. শামিনুল হক বলেন, “মুক্তিপণ দিয়ে জেলেদের ফিরে আসার বিষয়টি আমাদের জানা নেই। কেউ অভিযোগ করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সুন্দরবন এলাকায় টেকসই নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে জেলে ও বনজীবীদের জীবিকা আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে। নিয়মিত টহল, স্থানীয় তথ্যদাতাদের সক্রিয়করণ এবং আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি বলে তারা মত দেন।

এ ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল—প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক নির্মম বাস্তবতা, যেখানে জীবিকার সন্ধানে যাওয়া মানুষদের প্রতিদিন লড়াই করতে হয় জীবনের সাথেই।

Advertisement
Advertisement
Advertisement