অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস
মোয়াজ্জেম হোসেন রাসেল:
জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে একমাত্র টেস্টে ইনিংষ ব্যবধানে হারের পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতেও পরাজয় দিয়ে সফর শুরু করে বাংলাদেশ। সে হিসেবে অজিদের বিপক্ষে ২৩ বছর পর খেলতে নামা নাজমুল হোসেন শান্তর দলের সামনে ছিল নানা অনিশ্চয়তা। কতদিনে টেস্ট হারতে সেই শংকা পেয়ে বসে দলকে। এই অবস্থার মধ্যে মাত্র সাড়ে তিন দিনে প্যাট কামিন্সের দলকে হারিয়ে সবাইকে অবাক করে দিয়েছে। ৯ উইকেটের বড় ব্যবধানে জিতে নতুন একে ইতিহাস গড়েছে ফিল সিমেন্সর শীষ্যরা। এই সাফল্যের পর আবারও বাংলাদেশ দলকে নিয়ে হৈ চৈ শুরু হয়েছে চারিদিকে। প্রথম টেস্টে বড় ব্যবধানে জয়ে পর এখন চোঁখ রাখতে সিরিজ জয়ে।
৯ উইকেটের জয়ে দারুণ ইতিহাস
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রায় দুই যুগ পর টেস্ট খেলতে নেমে ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ। ডারউইনে সিরিজের প্রথম টেস্টে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়েছে লাল সবুজ প্রতিনিধিরা। ৫৭ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে এক উইকেট হারিয়ে জয় নিশ্চিত করে সফরকারীরা। এই জয়ে দুই ম্যাচের সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়াকে তাদের মাটিতে হারানো বাংলাদেশের জন্য সবসময়ই বড় চ্যালেঞ্জের। সেই চ্যালেঞ্জে এবার শুরু থেকেই দারুণ ক্রিকেট খেলেছে বাংলাদেশ। ম্যাচের প্রথম ইনিংসেই অস্ট্রেলিয়াকে ১৯৮ রানে গুটিয়ে দেয় বাংলাদেশের বোলাররা। এরপর ব্যাট হাতে ৪২৬ রান তুলে স্বাগতিকদের ওপর ২২৮ রানের বড় লিড নেয় বাংলাদেশ। প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের হয়ে ব্যাট হাতে সবচেয়ে বড় অবদান রাখেন তানজিদ হাসান তামিম। ১৯৭ বলে ১০১ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলেন তিনি। তাঁর ইনিংসে ছিল আটটি চার ও একটি ছক্কা। নাজমুল হোসেন শান্ত করেন ৮৪ রান। মেহেদী হাসান মিরাজের ব্যাট থেকে আসে ৬৫ রান। মুমিনুল হক করেন ৪৯ এবং মুশফিকুর রহিম করেন ৩৬ রান। বাংলাদেশের ৪২৬ রানের জবাবে দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া ২৮৪ রান করে। ফলে বাংলাদেশের সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রান।
বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ার দুর্গে ভারত-পাকিস্তানকে পেছনে ফেলল
প্রথম ইনিংসে ব্যাটিং ধস, বল হাতে বাংলাদেশের ওপর চাপ তৈরি করতে না পারা এবং দ্বিতীয় ইনিংসে মিরাজ-হাসানদের সামনে ব্যর্থতা। কোনো বিভাগেই স্বাগতিকরা ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি। বড় দল হওয়ায় বাংলাদেশের সঙ্গে তেমন একটা টেস্ট খেলতে চায় না অস্ট্রেলিয়া। তার ওপর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশকে টেস্ট খেলতে আমন্ত্রণ জানাতেও আগ্রহী নয় তারা। ২০০৩ সালে প্রথমবার অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়ে দুই টেস্টেই বড় ব্যবধানে হেরেছিল বাংলাদেশ। এরপর কেটে গেছে প্রায় ২৩ বছর। অবশেষে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলার সুযোগ পায় বাংলাদেশ। ২৩ বছর পর সেই সুযোগ পেয়েই ডারউইনে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ। এই জয়ে এশিয়ার অন্য পরাশক্তিদের পেছনে ফেলে নতুন এক রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জয়ের স্বাদ পেতে ভারতের খেলতে হয়েছিল ১২টি টেস্ট। পাকিস্তানের অপেক্ষা ছিল ৭ টেস্টের। শ্রীলঙ্কা অবশ্য ১৫টি টেস্ট খেলেও এখনো অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে জয়ের দেখা পায়নি। সেখানে বাংলাদেশ মাত্র তিনটি টেস্ট খেলেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তাদের ঘরের মাঠে প্রথম জয় তুলে নিয়েছে।
টস জিতে নেওয়া সিদ্ধান্তে অনুতপ্ত নন কামিন্স?
বাংলাদেশের বিপক্ষে ঘরের মাঠে প্রথমবারের মতো টেস্ট হারল অস্ট্রেলিয়া দল। টস জিতে ব্যাটিং নিয়েই তারা বিপাকে পড়েছিল। ১৯৮ রানে গুটিয়ে যায় তাদের প্রথম ইনিংস। আগে ব্যাটিং না নিলে কি ভিন্ন কিছু হতে পারত, এমন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। তবে কামিন্স স্পষ্ট করলেন আগে ব্যাটিং নিয়ে হারলেও অনুতপ্ত নন তিনি। কামিন্স বলেন, ‘আমি কি সিদ্ধান্তটি নিয়ে অনুতপ্ত? সম্ভবত না। আমি সম্ভবত আবারও একই সিদ্ধান্ত নিতাম। কারণ, আপনি যদি প্রথম এক ঘণ্টা পার করে দিতে পারেন, তাহলে প্রথম ঘণ্টার পর সিম মুভমেন্টের সংখ্যাও খুব বেশি ছিল না।’ তিনি বলে গেলেন, ‘তাই দল হিসেবে আমাদের আশা ছিল, আমরা আরও লম্বা সময় ব্যাটিং করতে পারব। টেস্টে আমরা যতক্ষণ ব্যাট করেছি, ১০০ ওভারের একটু বেশি, হয়তো ১৩০ ওভার বা এর কাছাকাছি। আমাদের আশা ছিল, এরপর আমরা ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ করব, যাতে চতুর্থ দিনের শেষ ভাগে কিংবা পঞ্চম দিনের এমন উইকেটে বোলিং করতে পারি, যেখানে বল ঘুরতে শুরু করবে এবং বোলারদের জন্য সহায়ক হবে।’ কামিন্স আরও বলেন, ‘আমি বলব না যে প্রতিটি টেস্ট ম্যাচেই আপনি যখন নামেন, তখন সবকিছু নির্দিষ্ট করে একইভাবে হবে। মাঝে মাঝে আপনাকে বলা হয়, ম্যাচটা এভাবে এগোবে, কিন্তু খেলোয়াড় হিসেবে আমরা জানি, সব সময় তা হয় না’।
ঐতিহাসিক জয়ে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী ও বাফুফের অভিনন্দন
ঐতিহাসিক জয়ের পর কিশোরগঞ্জ সফররত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভিডিও কলে কথা বলে বাংলাদেশ দলকে াভিনন্দন জানিয়েছেন। এই জয়ে সকল ক্রিকেটার, কোচিং স্টাফ ও ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্টদের আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক। এক অভিনন্দন বার্তায় প্রতিমন্ত্রী বলেন, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তাদের শক্তিশালী ক্রিকেট দলের বিপক্ষে মাত্র ৪ দিনে ৯ উইকেটের এই অবিস্মরণীয় জয় কেবল ঐতিহাসিক নয়, বরং বাংলাদেশ ক্রিকেটের নতুন এক স্বর্ণযুগের সূচনা। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত’র নেতৃত্বে পুরো দল ব্যাটে-বলে যে আত্মবিশ্বাস ও দাপট দেখিয়েছে, তা ১৭ কোটি বাঙালিকে চরম গর্বিত ও আনন্দিত করেছে। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের অসাধারণ সাফল্যে অভিনন্দন জানিয়েছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনও (বাফুফে)। ক্রিকেট দলের অস্ট্রেলিয়া-বধ পুরো ক্রীড়াঙ্গনকে আলোড়িত করেছে।