মেক্সিকোর ‘উদ্বোধনী অভিশাপ’ মোচন, ঘুরে দাঁড়িয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার অবিশ্বাস্য জয়

 প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ১২:৩১ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

মেক্সিকোর ‘উদ্বোধনী অভিশাপ’ মোচন, ঘুরে দাঁড়িয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার অবিশ্বাস্য জয়

 স্পোর্টস ডেস্ক:

উদ্বোধনী দিনের রোমাঞ্চ আর নাটকীয়তা কাকে বলে, তা যেন হাতেনাতে প্রমাণ করল ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের প্রথম দিনটি। একদিকে মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক আজটেকা স্টেডিয়ামে ভাঙল স্বাগতিকদের দীর্ঘদিনের এক ভূতুরে অভিশাপ, অন্যদিকে মাঠের অন্য প্রান্তে দেখা মিলল দক্ষিণ কোরিয়ার চেনা প্রত্যাবর্তনের রূপকথা। সব মিলিয়ে বিশ্বকাপের প্রথম দিনটি ফুটবলপ্রেমীদের প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে গেছে বহুদূরে। তবে মেক্সিকানদের উল্লাসের দিনে হৃদয় ভেঙেছে ‘বাফানা বাফানা’ খ্যাত দক্ষিণ আফ্রিকা সমর্থকদের।

ঘরের মাঠে ইতিহাস গড়ে মেক্সিকো পুরুষ দল ২-০ গোলে হারিয়ে দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকাকে। এর মাধ্যমে নিজেদের ফুটবল ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের উদ্বোধনী দিনের ম্যাচে জয়ের স্বাদ পেল ‘এল ট্রি’রা। এই ম্যাচের আগে বিশ্বমঞ্চের উদ্বোধনী দিনে মেক্সিকোর রেকর্ড ছিল চরম হতাশাজনক—পাঁচটি হারের বিপরীতে ড্র ছিল মাত্র দুটি। তবে এবার আর ভুল করেনি স্বাগতিকরা। হাইভোল্টেজ এই ম্যাচটি অবশ্য ফুটবলের চেয়ে বেশি ছড়ালো উত্তেজনা। পুরো ম্যাচে রেফারিকে মোট তিনটি লাল কার্ড দেখাতে হয়েছে, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে যেকোনো উদ্বোধনী ম্যাচের জন্য একটি অনন্য এবং অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ড। এর আগে ২০০৬ বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়া বনাম অস্ট্রেলিয়ার সেই কুখ্যাত ম্যাচে এমন তিন লাল কার্ডের ঘটনা ঘটেছিল।

এই জয়ের ফলে ঘরের মাঠে নিজেদের অপরাজেয় থাকার রেকর্ড আরও মজবুত করল মেক্সিকো। মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়ামে এখন তাদের সর্বকালের রেকর্ড ৬টি জয় ও ২টি ড্র, যেখানে পরাজয়ের কোনো নামনিশানা নেই। একই সাথে গ্রুপ পর্বের ম্যাচেও তারা ঘরের মাঠে অপরাজেয় থাকার ধারা বজায় রাখল। এই ঐতিহাসিক জয়ে মেক্সিকোর প্রাণভোমরা রাউল হিমেনেজ পেয়েছেন তার ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপ গোল। এই গোলের মাধ্যমে জাতীয় দলের হয়ে নিজের গোলসংখ্যা ৪৬-এ নিয়ে গেছেন তিনি, যা তাকে জ্যারেড বোর্গেত্তির সাথে যৌথভাবে মেক্সিকোর ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে বসিয়েছে। বর্তমানে ৫২ গোল নিয়ে শীর্ষে আছেন কিংবদন্তি হাভিয়ের "চিচারিতো" এর্নান্দেজ। ম্যাচের আরেকটি বড় প্রাপ্তি ছিল তরুণ তুর্কি গিলবার্তোর অভিষেক। মাত্র ১৭ বছর ২৪০ দিন বয়সে মাঠে নেমে তিনি মেক্সিকোর ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলোয়াড় হওয়ার গৌরব অর্জন করেন, যা একই সাথে কনকাকাফ অঞ্চলের জন্যও একটি নতুন রেকর্ড। তিনি ভেঙেছেন ১৯৩০ বিশ্বকাপে খেলা স্বদেশী ম্যানুয়েল রোসাসের ১৮ বছরের পুরোনো রেকর্ড।

দিনের অন্য ম্যাচে উয়েফা অঞ্চলের শক্তিশালী প্রতিপক্ষ চেকিয়ার বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও রূপকথার জয় তুলে নিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। ১-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পর অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে ম্যাচটি ২-১ ব্যবধানে জিতে নেয় এশিয়ান জায়ান্টরা। এটি বিশ্বকাপে দক্ষিণ কোরিয়ার অষ্টম জয়, যার মধ্যে সাতটি টুই এসেছে ইউরোপীয় পরাশক্তিদের বিরুদ্ধে। কোরিয়ানদের এই ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনের নায়ক হোয়াং ইন-বম। ম্যাচে গোল করার পাশাপাশি সতীর্থকে দিয়ে গোল করিয়ে অনন্য এক কীর্তি গড়েন তিনি। ১৯৯৪ সালের পর এই প্রথম কোনো দক্ষিণ কোরীয় খেলোয়াড় এবং ১৯৮৬ সালের পর মাত্র তৃতীয় ফুটবলার হিসেবে একই ম্যাচে গোল ও অ্যাসিস্ট করার ডাবল কৃতিত্ব দেখালেন তিনি।

পরাজিত হলেও চেকিয়া ফুটবল দল প্রথমার্ধে তাদের সেট-পিস শক্তির দারুণ মহড়া দিয়েছে। ম্যাচের প্রথম গোলটি আসে তাদের চেনা সেট পিস থেকেই। পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে নিজেদের ২৬টি গোলের মধ্যে ১০টিই তারা করেছিল সেট পিস থেকে, যা মূল পর্বেও ধরে রাখল তারা। তবে এই গোলটির পেছনে লুকিয়ে ছিল দীর্ঘ এক অপেক্ষার অবসান। ২০০৬ সালের ১২ই জুনের পর এই প্রথম বিশ্বকাপে গোলের দেখা পেল চেকিয়া। কাকতালীয়ভাবে, ঠিক ২০ বছর পর একই দিনে তারা বিশ্বকাপে নিজেদের পরবর্তী গোলটি উদযাপন করল। তবে এই হারের ফলে টানা ছয় ম্যাচে অপরাজিত থাকার পর অবশেষে হারের তেতো স্বাদ আস্বাদন করতে হলো ইউরোপের এই দলটিকে। টুর্নামেন্টে নামার আগে ৪ জয় ও ২ ড্র নিয়ে উড়তে থাকা চেকিয়াকে মাটিতে নামিয়ে এনে এশিয়ান ফুটবলের শক্তি জানান দিল দক্ষিণ কোরিয়া। উদ্বোধনী দিনের এই রোমাঞ্চকর লড়াইগুলোই বলে দিচ্ছে, এবারের বিশ্বকাপ কতটা জমজমাট ও অনিশ্চয়তায় ভরা হতে যাচ্ছে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement