ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির লক্ষ্য সামনে রেখে আসছে নতুন বাজেট

 প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ০৭:৫৩ পূর্বাহ্ন   |   জাতীয়

ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির লক্ষ্য সামনে রেখে আসছে নতুন বাজেট

‘অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন ও বিনিয়ন্ত্রণকরণ: ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির অভিযাত্রায় বাংলাদেশ’এমন একটি সম্ভাব্য প্রতিপাদ্য নিয়ে আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বাজেট বক্তৃতার চূড়ান্ত প্রস্তুতি এখন শেষ পর্যায়ে, আর কয়েক দিনের মধ্যেই বক্তৃতার বই মুদ্রণের জন্য পাঠানো হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বাজেটের শিরোনাম চূড়ান্ত করতে এখনো আলোচনা চলছে। সম্ভাব্য শিরোনামের তালিকায় রয়েছে ‘অর্থনৈতিক বিনিয়ন্ত্রণকরণ, সবার জন্য উন্নয়ন’, ‘অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন ও বিনিয়ন্ত্রণকরণ: সবার জন্য উন্নয়ন’, ‘মানবিক কল্যাণমূলক ও উৎপাদনমুখী দেশ: কর্মসংস্থান, সুশাসন ও সমতায় সমৃদ্ধ বাংলাদেশ’, ‘বৈষম্যহীন টেকসই ও ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি গড়ার প্রত্যয়’ এবং ‘অর্থনৈতিক পুনর্গঠন: ক্রিয়েটিভ অর্থনীতির নতুন বাংলাদেশ’। এসবের মধ্য থেকে একটি শিরোনাম চূড়ান্ত করা হবে।

গুরুত্ব পাচ্ছে অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন

নীতিনির্ধারকদের মতে, বাজেটের অন্যতম দর্শন হিসেবে ‘অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন’ ধারণাকে সামনে আনা হচ্ছে। এর লক্ষ্য হলো অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা সীমিত গোষ্ঠীর মধ্যে কেন্দ্রীভূত না রেখে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়া।

পাশাপাশি ‘বিনিয়ন্ত্রণকরণ’ বা ডিরেগুলেশনকে গুরুত্ব দিয়ে ব্যবসা পরিচালনায় প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। ব্যবসা শুরু, লাইসেন্স গ্রহণ, আমদানি-রপ্তানি এবং শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা হ্রাসের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রত্যাশা করছে সরকার।

বাস্তবভিত্তিক বাজেটের ওপর জোর

সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ মনে করেন, নতুন সরকারের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাজেট। তাঁর মতে, অর্থনীতি বর্তমানে পুনরুদ্ধারের পথে থাকায় বাজেট প্রণয়নে বাস্তবতা ও সক্ষমতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। রাজস্ব আহরণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ জরুরি।

তিনি বলেন, বৈদেশিক ঋণ নিজেই সমস্যা নয়; তবে সেই অর্থ উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

মূল্যস্ফীতি ও রাজস্ব সংগ্রহ বড় চ্যালেঞ্জ

বর্তমানে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সর্বশেষ হিসাবে মে মাসে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী অর্থবছরে তা ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা কঠিন হতে পারে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, আর বিনিয়োগ বাড়াতে হলে ব্যবসায়িক আস্থা পুনরুদ্ধার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, আর্থিক সুশাসন এবং নীতিগত স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট

সূত্রগুলো জানিয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে সম্ভাব্য বাজেট ঘাটতি দাঁড়াবে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা

সরকার আগামী অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ৬৮ লাখ ৩০ হাজার ২৪ কোটি টাকা, প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে বিশেষ গুরুত্ব

নতুন বাজেটের মূল লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ, ব্যবসা সহজীকরণ, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার ভিত্তি তৈরি।

সরকারি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং কর্মসংস্থানের ধীরগতিই অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল। তাই শিল্প, কৃষি, রপ্তানি, প্রবাসী আয় ও অবকাঠামো খাতে নীতিগত সহায়তা অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

ঘাটতি অর্থায়নে বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা

আসন্ন বাজেটের আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ঘাটতি অর্থায়নের কাঠামো। মোট ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতির মধ্যে বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সময়ে বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধে ব্যয় হবে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা। ফলে নিট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা

অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা, সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য উৎস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এডিপিতে ৩ লাখ কোটি টাকা

প্রস্তাবিত বাজেটে পরিচালন ও অন্যান্য ব্যয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া সরকারের অনুমোদিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি)-তে ইতোমধ্যে ৩ লাখ কোটি টাকা বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শুধু বাজেটের আকার বাড়ালেই হবে না; শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর বিনিয়োগ নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

Advertisement
Advertisement
Advertisement