চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনাল: ডিপি ওয়ার্ল্ড নিয়ে সরকারের দ্বিধা, দ্রুত সিদ্ধান্তের চাপ

 প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬, ১২:১১ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনাল: ডিপি ওয়ার্ল্ড নিয়ে সরকারের দ্বিধা, দ্রুত সিদ্ধান্তের চাপ

অর্থ ও বানিজ্য ডেস্ক:

চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে লাভজনক নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনা নিয়ে সরকার এখন এক অস্বস্তিকর অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। দুবাইভিত্তিক বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে চলমান আলোচনা এগিয়ে নিতে হবে, নয়তো পুরো প্রক্রিয়া বাতিল করতে হবে—এমন নির্দেশনা দিয়েছে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়।

গত ৪ জুন মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন-১ অধিশাখা থেকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়, এনসিটি পরিচালনার জন্য ইনডিপেনডেন্ট টার্মিনাল অপারেটর (আইটিও) নিয়োগের লক্ষ্যে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। আলোচনায় অনিচ্ছা থাকলে পুরো প্রক্রিয়া বাতিলের ব্যবস্থা নিতে হবে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পূর্ববর্তী চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে এ নির্দেশনা আসে। এর আগে পিপিপি কর্তৃপক্ষও জানিয়েছিল, এনসিটি প্রকল্পটি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ আইন ২০১৫ এবং গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট (জিটুজি) পার্টনারশিপ নীতিমালা ২০১৭ অনুযায়ী বাস্তবায়িত হচ্ছে। ফলে উন্মুক্ত দরপত্রের বিধান এখানে প্রযোজ্য নয়, বরং দ্বিপক্ষীয় চুক্তির ভিত্তিতেই বিনিয়োগকারী নির্বাচন ও চুক্তির শর্ত নির্ধারণ হবে।

বর্তমানে এনসিটি পরিচালনা করছে নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাই ডক লিমিটেড। এর আগে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড দায়িত্বে ছিল। এনসিটি ২০০৭ সালে আংশিক এবং ২০১৫ সালে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হওয়ার পর থেকেই চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আয়ের উৎসে পরিণত হয়। সদ্যসমাপ্ত মে মাসে টার্মিনালটিতে সর্বোচ্চ ১ লাখ ২৬ হাজার ৪৯৬ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে, যা এনসিটির ইতিহাসে এক মাসে সর্বোচ্চ রেকর্ড।

বন্দর সচিব জানিয়েছেন, কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বৃদ্ধি, জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানামার গতি বৃদ্ধি এবং ইয়ার্ড ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বৃদ্ধির ফলে এ অর্জন সম্ভব হয়েছে। এতে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন হচ্ছে, যা দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের জন্য ইতিবাচক।

তবে প্রশ্ন উঠছে—দেশের সবচেয়ে লাভজনক টার্মিনাল বিদেশি অপারেটরের হাতে তুলে দেয়া কতটা যৌক্তিক। সাবেক কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক অপারেটর যুক্ত হলে সক্ষমতা ও স্বচ্ছতা বাড়ে, তবে গ্রিনফিল্ড প্রকল্পে যেখানে সরকারের বিনিয়োগ নেই সেখানে বিদেশি অপারেটর যুক্ত করাই যৌক্তিক। কিন্তু এনসিটি ইতিমধ্যেই রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে নির্মিত এবং লাভজনকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এখানকার রাজস্ব পুরোপুরি দেশে থেকে যাচ্ছে।

ডিপি ওয়ার্ল্ড বিশ্বের ৭০টিরও বেশি দেশে বন্দর পরিচালনা করে। তারা প্রায় সাত বছর আগে বাংলাদেশের লজিস্টিকস অবকাঠামো উন্নয়নে এক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছিল। সর্বশেষ দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত সভায় তারা এনসিটি পরিচালনার ক্ষেত্রে রাজস্ব, ব্যয় ও জনবল কাঠামোতে স্বচ্ছতা, ১৫ বছরের কনসেশন মেয়াদ পুনর্বিবেচনা এবং আধুনিকায়নে বিনিয়োগের বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়েছে।

নৌ-পরিবহনমন্ত্রীও স্বীকার করেছেন, ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রস্তাবে ইতিবাচক সম্ভাবনা থাকলেও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যা সতর্কভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। ফলে এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার চাপ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ওপর পড়েছে।

এনসিটি নিয়ে আলোচনার ইতিহাসও দীর্ঘ। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে ১৫ বছরের ইজারা নিয়ে দরকষাকষি হয়েছিল, কিন্তু চাপের মুখে তা আর বাস্তবায়িত হয়নি। এখন আবার সেই আলোচনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) জানিয়েছেন, দেশের স্বার্থকে সামনে রেখেই এনসিটি পরিচালনার ভবিষ্যৎ ঠিক করা হবে। তবে স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে, সরকারের দ্বিধা কাটিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া ছাড়া আর কোনো পথ নেই।

Advertisement
Advertisement
Advertisement