উপকূলে সুরক্ষার নতুন দিগন্ত: জলবায়ু অভিযোজন ও টেকসই উন্নয়নের মহাপরিকল্পনা

 প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬, ০৬:১৮ পূর্বাহ্ন   |   জাতীয়

উপকূলে সুরক্ষার নতুন দিগন্ত: জলবায়ু অভিযোজন ও টেকসই উন্নয়নের মহাপরিকল্পনা

​নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা

​ভৌগোলিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ একটি বদ্বীপ রাষ্ট্র, যার হৃৎস্পন্দন মিশে আছে বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশিতে। তবে এই সুবিশাল উপকূল যেমন সম্ভাবনার দুয়ার, তেমনি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রকোপে এটি এখন অস্তিত্বের সংকটে। উত্তাল সমুদ্রের ঢেউ আর লোনা পানির আগ্রাসন রুখতে প্রথাগত বাঁধ নয়, বরং প্রয়োজন আধুনিক প্রকৌশল ও প্রকৃতির মেলবন্ধন। এই প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখেই সম্প্রতি রাজধানীর আইইবি মিলনায়তনে ধ্বনিত হলো উপকূল রক্ষার নতুন অঙ্গীকার। পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা আর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে ক্ষয়রোধী ও টেকসই উপকূলীয় অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে। এটি এখন আর কোনো বিলাসী পরিকল্পনা নয়, বরং সময়ের এক অনিবার্য দাবি।

​রবিবার সকালে ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার্স (আইইবি) মিলনায়তনে এক বিশেষ সেমিনারের আয়োজন করা হয়। ‘বাংলাদেশে ক্ষয়রোধী উপকূলীয় অবকাঠামো এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল উদ্বোধন ও সনদ প্রদান’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী উপকূলীয় জনপদের জীবনসংগ্রাম ও আগামীর চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে আমাদের এই সংবেদনশীল জনপদে পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। একদিকে কমছে আবাদি জমি, অন্যদিকে বাড়ছে জীবন-জীবিকার অনিশ্চয়তা। মৎস্যজীবীদের সংখ্যা বাড়লেও সমুদ্র সম্পদের অতিব্যবহার এবং লোনা পানির প্রবেশ কৃষিকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। বিশেষ করে ম্যানগ্রোভ বন উজাড় হওয়ায় প্রাকৃতিক যে বর্মটি আমাদের ছিল, সেটি আজ দুর্বল।

​মন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ভয়াবহ চিত্র। সমুদ্রের জলস্তর যত বাড়ছে, উপকূলের মাটি তত বেশি ক্ষয়ে যাচ্ছে। নোনা জল ঢুকে ফসলি জমিকে করে তুলছে অনুর্বর। এই সমস্যা শুধু কৃষিতেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি পুরো বাস্তুতন্ত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সামুদ্রিক দূষণ রোধে এবং এই ভূখণ্ডকে রক্ষা করতে তাই পরিবেশবান্ধব প্রকৌশল ও জলবায়ু সহনশীল নকশার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। মন্ত্রী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে একটি সুরক্ষিত উপকূল গড়ার আহ্বান জানান।

​উন্নয়নের এই যাত্রায় বর্তমান সরকারের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার এক নতুন বিপ্লবের পথে হাঁটছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সেই কালজয়ী ‘খাল খনন কর্মসূচি’কে আধুনিক রূপে পুনরুজ্জীবিত করা হচ্ছে। আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী, খাল ও জলাশয় খননের এক বিশাল কর্মযজ্ঞ হাতে নেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি উপকূলীয় অঞ্চলে সবুজ বেষ্টনী গড়ার লক্ষ্যে ২৫ কোটি বৃক্ষ রোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই বনায়ন কেবল সৌন্দর্যবর্ধন নয়, বরং ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের বিরুদ্ধে এক অজেয় দেয়াল হিসেবে কাজ করবে।

​অনুষ্ঠানে মন্ত্রী উপকূলীয় অঞ্চলের সুরক্ষায় আইনি কাঠামোর প্রয়োজনীয়তাও ব্যাখ্যা করেন। তিনি জানান, 'কোস্টাল জোন ম্যানেজমেন্ট রুলস' এবং 'স্পেশাল ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান' তৈরি করা এখন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। আবাদি জমি রক্ষা এবং ভূগর্ভস্থ পানির অপচয় রোধে কঠোর আইন প্রণয়নের আভাস দেন তিনি। বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আধুনিকায়ন করে সমুদ্রকে দূষণমুক্ত রাখার ওপর তিনি বিশেষ জোর দেন। মন্ত্রীর মতে, একটি সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়া উপকূলের মানুষ ও প্রকৃতি—কাউকেই রক্ষা করা সম্ভব নয়।

​আইইবি’র ৭৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বিশেষজ্ঞ মহলের সরব উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিভিশনের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম খোকনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজউক ও আইইবি’র চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ রিয়াজুল ইসলাম এবং এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী ইঞ্জিনিয়ার মো. বেলাল হোসেন। তারা সবাই একমত পোষণ করেন যে, আধুনিক প্রকৌশলবিদ্যার প্রয়োগ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের এই দানবীয় শক্তিকে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন প্রফেসর ড. মো. তারেক উদ্দিন, যিনি তার গবেষণায় উপকূলীয় ক্ষয়রোধের বিভিন্ন যান্ত্রিক ও প্রাকৃতিক কৌশল তুলে ধরেন।

​সেমিনারের শেষ পর্যায়ে প্রশিক্ষণার্থীদের হাতে সনদ তুলে দেওয়া হয়। উপস্থিত প্রকৌশলী ও নীতিনির্ধারকদের চোখে-মুখে ছিল এক প্রত্যয়ী আগামীর স্বপ্ন। উপকূলের প্রতিটি ইঞ্চি মাটি রক্ষায় যে শপথ আজ নেওয়া হলো, তা যদি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে বঙ্গোপসাগরের কূল ঘেঁষে গড়ে ওঠা জনপদগুলো আর আতঙ্কে থাকবে না। বরং এক সুশৃঙ্খল, টেকসই ও সুরক্ষিত জনপদ হিসেবে বাংলাদেশের মানচিত্রে জ্বলজ্বল করবে আমাদের প্রিয় উপকূল। সমাপনী বক্তব্যে মন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, সরকার, প্রকৌশলী ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ জলবায়ু অভিঘাত মোকাবিলায় বিশ্বের কাছে এক রোল মডেল হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকবে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement