মেগা প্রকল্পের নামে মেগা দুর্নীতি বন্ধের আহ্বান সারজিস আলমের, রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে কঠোর মন্তব্য

 প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৬, ০৩:২১ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

মেগা প্রকল্পের নামে মেগা দুর্নীতি বন্ধের আহ্বান সারজিস আলমের, রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে কঠোর মন্তব্য


ঢাকায় আয়োজিত এক জাতীয় কনভেনশনে বর্তমান সরকারের প্রতি কঠোর বার্তা দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। তিনি বলেছেন, ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন প্রকল্পগুলো যেন কোনোভাবেই “মেগা প্রকল্পের নামে মেগা দুর্নীতির” শিকার না হয়। উন্নয়নকে টেকসই ও জনগণের স্বার্থে রাখতে হলে প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করা জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন।

রোববার (৩ মে) দুপুরে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে এনসিপির সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটির আয়োজিত জ্বালানি, অর্থনীতি সংস্কার ও গণভোট বিষয়ক জাতীয় কনভেনশনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বড় প্রকল্পগুলোকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিতে অস্বচ্ছতা ও অনিয়মের অভিযোগ জনমনে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। তাঁর মতে, উন্নয়নের নামে গৃহীত অনেক উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত দেশের ওপর আর্থিক চাপ বাড়িয়েছে।

সারজিস আলম অভিযোগ করে বলেন, বিগত বছরগুলোতে বিভিন্ন মেগা প্রকল্পকে ঘিরে বিপুল পরিমাণ অর্থ অপচয় ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত প্রকল্পও দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বিশেষভাবে ঋণনির্ভর উন্নয়ন মডেলের সমালোচনা করে বলেন, বিদেশি ঋণের ভার ক্রমাগত বাড়তে থাকায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর বড় ধরনের আর্থিক দায় চাপছে।

তিনি আরও বলেন, দেশের অর্থনীতি এখন এমন এক অবস্থায় দাঁড়িয়েছে যেখানে ঋণ নির্ভরতা, খেলাপি সংস্কৃতি এবং অর্থ পাচার একটি কাঠামোগত সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও তিনি সতর্ক করেন।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিশ্লেষণ ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি দাবি করেন, বড় প্রকল্পগুলোতে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা এবং অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হচ্ছে। তবে এসব বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্ত ও কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়ায় জনমনে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি আরও বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে নেওয়া কিছু চুক্তি ও নীতিগত সিদ্ধান্তের ফলে রাষ্ট্রীয় ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, যেখানে বিদ্যুৎ ব্যবহার হোক বা না হোক নির্দিষ্ট খাতে অর্থ প্রদান করতে হচ্ছে—এমন ব্যবস্থাকে তিনি প্রশ্নবিদ্ধ হিসেবে উল্লেখ করেন।

ব্যাংকিং খাত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে সারজিস আলম বলেন, আর্থিক খাতে অনিয়ম, ঋণ কেলেঙ্কারি এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দখলদারিত্বের কারণে সাধারণ জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, এসব অনিয়ম রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে দুর্বল করছে এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়িয়ে তুলছে।

তিনি বলেন, “রাষ্ট্রের ভেতরে বিভাজন সৃষ্টি হলে সুবিধাভোগী গোষ্ঠীই লাভবান হয়।” তাই রাজনৈতিক ও সামাজিক ঐক্য গড়ে তুলে দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।

সারজিস আলম বর্তমান সরকারকে আহ্বান জানিয়ে বলেন, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, ঋণখেলাপি সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে এবং অর্থ পাচার রোধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে আন্ডারটেবিল আলোচনার সংস্কৃতি বন্ধ করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্র সংস্কার একটি সম্মিলিত দায়িত্ব, যেখানে সরকার, প্রশাসন, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ জনগণ—সবাইকে ভূমিকা রাখতে হবে। তবে নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাদের সিদ্ধান্তই দেশের ভবিষ্যৎ দিক নির্ধারণ করে।

বক্তব্যের শেষাংশে তিনি বলেন, জনগণ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। তাই রাষ্ট্রবিরোধী বা জনস্বার্থবিরোধী যেকোনো উদ্যোগের বিরুদ্ধে জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

Advertisement
Advertisement
Advertisement