সংবাদ শিরোনাম

শ্রীপুরে শিল্পাঞ্চলের বিস্তারে বিলীন হচ্ছে খেজুর গাছ

 প্রকাশ: ২৪ নভেম্বর ২০২৫, ০১:৫৫ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

শ্রীপুরে শিল্পাঞ্চলের বিস্তারে বিলীন হচ্ছে খেজুর গাছ

রতন প্রধান, শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি:

গাজীপুরের শ্রীপুর—যেখানে এক সময় শীতের সকালে খেজুর রসের মিঠে সুবাস ভেসে বেড়াত, সেই অঞ্চলেই এখন রসের হাঁড়ি খুঁজে পাওয়া দুর্লভ। বিস্তীর্ণ শিল্পাঞ্চল, আবাসন প্রকল্প আর অনিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কারণে দ্রুত কমে যাচ্ছে খেজুর গাছ। ফলে রস সংগ্রহকারীদের (ফিতেওয়ালা) সংখ্যা যেমন কমছে, তেমনি কমে যাচ্ছে শ্রীপুরবাসীর প্রিয় শীতকালীন ঐতিহ্য—তাজা খেজুর রস।

শিল্পায়নের চাপে হারিয়ে যাচ্ছে গাছ শ্রীপুরের মাওনা, গাছা, বরমী, তেলিহাটি, গলদাপাড়া, কাওরাইদ—এই সব এলাকায় গত এক দশকে জমি দখল করেছে ছোট-বড় কারখানা ও বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান। কৃষিজমি ও পতিত জমি কমে যাওয়ায় খেজুর গাছ লাগানোর সুযোগও সংকুচিত। যে খেজুর গাছগুলো রয়েছে, সেগুলোরও বেশিরভাগই অবহেলায় ক্ষতিগ্রস্ত।

স্থানীয় বাসিন্দা হেলাল উদ্দিন জানান, “এক সময় গ্রামের প্রতিটি বাড়ির পাশে খেজুর গাছ দেখা যেত। এখন শিল্পের দৌড়ে সেই গাছ প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে রসের হাঁড়ি দেখা তো দূরের কথা, রসের গন্ধও আর পাওয়া যায় না।”

ফিতে শ্রমিকের অভাব—ঐতিহ্য হারানোর আরেক কারণ শুধু গাছ কমে যাওয়া নয়, খেজুর গাছ ছাঁটাই ও রস সংগ্রহে দক্ষ ফিতে শ্রমিকও আজ বিলুপ্তপ্রায়। নতুন প্রজন্ম এই পেশায় আগ্রহ হারাচ্ছে, কারণ একে পেশা হিসেবে গ্রহণ করে পরিবার চালানো কঠিন।

স্থানীয় ফিতে শ্রমিক আবদুল করিম জানান, “আগে ৩০–৪০টা গাছে ফিতে দিতাম। এখন গাছই নেই। তাছাড়া এই কাজে যেমন ঝুঁকি আছে, তেমনি আয়ও কম। তাই ছেলেরা আর এই কাজ শেখে না।”

রসের অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় ব্যবসাও শ্রীপুরে শীত আসলে যেসব চায়ের দোকান বা স্থানীয় বাজারে খেজুর রসের পায়েস, গুড় ও পাটালি বিক্রি হতো, সেসব ব্যবসায়ীরা এখন হতাশ। রস না পাওয়ায় অনেকেই এই মৌসুমি ব্যবসা বন্ধ করে দিচ্ছেন।

গাছি-নির্ভর ব্যবসায়ী আবুল বাসার বলেন, “আগে মৌসুমে প্রতিদিন ২০–৩০ লিটার রস আনতে পারতাম। এখন ৫ লিটার রসও মেলে না। তাই ব্যবসা বন্ধ করে দিতে হচ্ছে।”

পরিবেশবিদদের সতর্কতা: দের মতে, শিল্পায়ন জরুরি হলেও এর সঙ্গে পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। খেজুর গাছ শুধু রসের উৎস নয়; প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষাতেও গুরুত্বপূর্ণ।

তারা বলছেন, পরিকল্পিতভাবে খেজুর গাছ রোপণ ও সংরক্ষণ না করলে কয়েক বছরের মধ্যে এই অঞ্চলে খেজুর গাছ পুরোপুরি বিলীন হয়ে যেতে পারে।

স্থানীয়দের দাবি: খেজুর গাছ সংরক্ষণে উদ্যোগ চাই শ্রীপুরবাসীর দাবি—স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশ দফতর ও কৃষি বিভাগ যৌথ উদ্যোগে খেজুর গাছ সংরক্ষণ ও নতুন গাছ রোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করুক। স্কুল-কলেজ পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানো এবং গাছি বা ফিতে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ ও সহায়তা প্রদানও জরুরি।

স্থানীয় শিক্ষক মনিরুল ইসলাম বলেন, খেজুর রস গ্রামীণ সংস্কৃতির অংশ। এটি শুধু খাবার নয়, আমাদের শেকড়ের স্মৃতি। শ্রীপুরে সেই ঐতিহ্য বাঁচাতে সরকারি–বেসরকারি উদ্যোগ অত্যন্ত প্রয়োজন।

শ্রীপুরে শিল্পাঞ্চলের বিকাশ যেমন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এনেছে, তেমনি পরিবেশ ও ঐতিহ্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। খেজুর গাছের সংখ্যা দ্রুত কমে যাওয়া এবং রস সংগ্রহ বন্ধ হওয়া শুধু একটি মৌসুমী খাবারের ক্ষতি নয়—এটি গ্রামীণ সংস্কৃতি হারানোর সূচনা। এখনই পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শুধু গল্পেই শুনবে “শ্রীপুরের খেজুর রস”-এর কথা।