নিয়োগের 'কারখানা' রাবি: দেড় বছরে পৌনে পাঁচশ নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও জামায়াতীকরণের অভিযোগ
রাজশাহী ব্যুরো।।
ক্যাম্পাসজুড়ে তখন জুলাই অভ্যুত্থানের রেশ। একদিকে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন, অন্যদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) প্রশাসনিক ভবনে বসে চলছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃশ্যপট। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে, মেধা তালিকা উপেক্ষা করে, এমনকি যোগ্য প্রার্থীদের বাদ দিয়ে তড়িঘড়ি করে চলছে নিয়োগ বাণিজ্য। নিয়োগের এমন এক ‘কারখানা’ গড়ে তুলেছিলেন সদ্য সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ্ হাসান নকীব। তাঁর সাড়ে ১৫ মাসের (৫৫৭ দিন) দায়িত্ব পালনকালে অন্তত ৪৭৮ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়, যার অধিকাংশ নিয়েই উঠেছে স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ ও জামায়াতীকরণের ভয়াবহ অভিযোগ।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই নিয়োগে মরিয়া হয়ে ওঠেন অধ্যাপক নকীব। রাবির ইতিহাসে এর আগে কোনো উপাচার্য এত অল্প সময়ে এত বিশাল সংখ্যক জনবল নিয়োগ দেওয়ার নজির নেই। এই দেড় বছরে ১৫টি সিন্ডিকেট বৈঠকের মাধ্যমে তিনি ১৫৪ জন শিক্ষক, ছয় চিকিৎসক, তিন কর্মকর্তা এবং ৩১৫ জন তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, জুলাই চেতনার আড়ালে তিনি জামায়াতপন্থি শিক্ষকদের আধিপত্য বিস্তারে সক্রিয় ছিলেন।
মেধা তালিকার শীর্ষে থাকা প্রার্থী যখন উপেক্ষিত
নিয়োগের নামে অনিয়মের সবচেয়ে বড় উদাহরণ পাওয়া যায় উর্দু বিভাগের শিক্ষক নিয়োগে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী এ সালাম স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জনের পাশাপাশি দুবার স্বর্ণপদক জয়ী। রাবির উর্দু বিভাগের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় মেধা তালিকায় তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। অথচ, প্রশাসন তাঁকে বাদ দিয়ে মেধা তালিকার চতুর্থ জনকে নিয়োগ দেয়। এমনকি এই অনিয়মের প্রতিবাদে নিয়োগ বোর্ডের বিশেষজ্ঞ সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. ইস্রাফিল চূড়ান্ত ফলের নথিতে সই করতে অস্বীকার করেন। এরপরও প্রশাসন সেই বিতর্কিত নিয়োগ বৈধ করে। এ নিয়ে গত ২৪ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ের লিগ্যাল সেলে লিখিত অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী এ সালাম।
অ্যাডহক নিয়োগে অনিয়ম ও অযোগ্যতার ছড়াছড়ি
নিয়োগের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত আইন ও ইউজিসির নীতিমালা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর অভিযোগ রয়েছে নকীব প্রশাসনের বিরুদ্ধে। নিয়ম অনুযায়ী প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা হতে হলে ন্যূনতম স্নাতক ডিগ্রি প্রয়োজন। অথচ আইসিটি সেন্টারে মোমেন খন্দকার অপি নামের একজনকে স্নাতক পাশের আগেই নিয়োগ দেওয়া হয়, যিনি এইচএসসি পাসের সনদে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। একই দপ্তরে শরিফুল ইসলাম নামে আরেকজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, যিনি নিয়োগের সময় দেওয়া ডিগ্রি বা সনদের কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেননি। পরে তাঁর চাকরি বাতিল করা হয়। এছাড়া, জনবল নিয়োগের জন্য কোনো বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই ‘অ্যাডহক’ ভিত্তিতে রাজনৈতিক বিবেচনায় চিকিৎসক ও কর্মকর্তা নিয়োগের ঘটনাও কম নয়।
নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে কৌশল ও স্বজনপ্রীতি
নিয়োগকে বিতর্কিত করতে প্রশাসনের কৌশল ছিল লক্ষণীয়। ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিম্যাল সায়েন্স বিভাগে একটি শূন্য পদের বিপরীতে ১০ জনের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল, যা ইউজিসির নিয়োগ নীতিমালার পরিপন্থি। সংবাদ প্রকাশের পর সেই নিয়োগ আটকে যায়। আবার চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক মোহাম্মদ আলীর ভাইকে নিয়োগ দিতে মাস্টার্স ডিগ্রির শর্তে পরিবর্তন আনার মতো ঘটনাও ঘটেছে। এছাড়া উপাচার্য নিজেই নিজের শ্বশুরকে ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন। নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষক নিয়োগে আর্থিক লেনদেনের ফোনালাপ ভাইরাল হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনা হলেও প্রশাসন তা আমলে নেয়নি।
শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টদের প্রতিক্রিয়া
বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসি বিভাগের অধ্যাপক মামুনুর রশিদ জানান, নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধাবীদের মূল্যায়ন করা হয়নি, বরং একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে খুশি করাই ছিল মুখ্য উদ্দেশ্য। রাবির ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহীর অভিযোগ, প্রশাসন ভবনকে নিয়োগ বাণিজ্য ও রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের কারখানায় পরিণত করেছিলেন সাবেক উপাচার্য।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ্ হাসান নকীব। তিনি দাবি করেন, নিয়োগে কোনো দুর্নীতি বা সুপারিশকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়নি। যদিও বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলাম বিষয়টি ভিন্ন চোখে দেখছেন। তিনি বলেন, “কিছু কিছু নিয়োগে কোনো রকম নিয়মনীতি মানা হয়নি। রেজিস্ট্রারকে এড়িয়ে উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য সরাসরি অনেক নিয়োগ দিয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রেই মেধা বিবেচনা করা হয়নি। এসব বিষয়ে অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে এখন বইছে স্বচ্ছতার দাবি। যারা মেধার ভিত্তিতে বঞ্চিত হয়েছেন, তাদের প্রশ্ন—এই অবৈধ নিয়োগ কি স্থায়ী হবে, নাকি নতুন প্রশাসন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে? ক্যাম্পাসের সাধারণ শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এখন সেই উত্তরের অপেক্ষায়।