তিন দলের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ: নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সুযোগ সন্ধান
নিজস্ব প্রতিবেদক:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশের রাজনীতিতে প্রত্যাশিত স্বস্তি ফেরেনি। বরং বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র মধ্যে নানা ইস্যুতে বিরোধ ও অনৈক্য দেখা দিয়েছে। এই বিরোধকে কাজে লাগিয়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ আবারও রাজনীতির মাঠে প্রবেশের সুযোগ খুঁজছে।
নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অস্থিরতা
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং জামায়াত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন পায়। তরুণদের প্রতিনিধিত্বকারী এনসিপিও সংসদে জায়গা করে নেয়। কিন্তু সংবিধান সংস্কার, জুলাই সনদের বাস্তবায়ন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সিন্ডিকেট ভাঙার মতো মৌলিক ইস্যুতে দলগুলো একক সিদ্ধান্তে আসতে পারছে না। বরং সভা-সমাবেশে একে অপরের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা অব্যাহত রেখেছে।
আওয়ামী লীগের কৌশল
অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। সংসদে আইন পাস হওয়ার পর তাদের রাজনীতিতে ফেরার আশা আরও ক্ষীণ হয়ে যায়। তবে দলটি এখন বিএনপি সরকারের ব্যর্থতা দেখতে আগ্রহী এবং তিন দলের বিরোধকে উসকে দিয়ে সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গোপন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে তারা বিভেদ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় ঝটিকা মিছিল ও আকস্মিক হামলার মাধ্যমে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে।
সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড
নোয়াখালী, কুমিল্লা, ঝিনাইদহ, ময়মনসিংহ, গোপালগঞ্জ, পটুয়াখালী ও চট্টগ্রামে সম্প্রতি আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল দেখা গেছে। নিষিদ্ধ ছাত্রলীগও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে মিছিল করেছে। এসব কর্মকাণ্ডে তারা দেখাচ্ছে যে নিষিদ্ধ হলেও পুরোপুরি অদৃশ্য হয়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জুলাই মুভমেন্টে অংশ নেওয়া দলগুলোর মধ্যে ফাটল দেখা দিলে আওয়ামী লীগ বা অন্য কোনো তৃতীয় শক্তি সুযোগ নিতে পারে। তাই জাতীয় স্বার্থে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপিকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
দলগুলোর প্রতিক্রিয়া
বিএনপির নেতারা অভিযোগ করছেন, ইসলামের নাম ব্যবহার করে কিছু দল আসলে পুরোনো আওয়ামী লীগের উত্তরাধিকার বহন করছে। তারা যুক্তিহীন বিরোধিতার নেতিবাচক রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
জামায়াত বলছে, আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করা আর সরকারের সমালোচনা করা এক নয়। তারা মনে করে, বিএনপি ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করছে।
এনসিপি বলছে, তিন দলের বৈরিতা চলমান থাকলে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সুযোগ নেবে। তারা দাবি করছে, দলকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করতে হবে এবং জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।
সামনে কী অপেক্ষা করছে
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিরোধ আরও বাড়তে পারে। বিএনপি যদি আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ডকে কাজে লাগায়, তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও তীব্র হতে পারে। অন্যদিকে, দলগুলোর ঐক্য না হলে আওয়ামী লীগ ফেরার শক্তি পাবে।
পরিশেষে,
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন এক সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ চলছে। বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে বিরোধ যত বাড়ছে, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ততই সুযোগ পাচ্ছে। জাতীয় স্বার্থে দলগুলোর ঐক্য অপরিহার্য, নইলে সংঘাতময় পরিস্থিতি আবারও রাজনীতিকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।