সদরঘাটের ওপর চাপ কমাতে বিকল্প দুয়ার: বসিলা ও শিমুলিয়ায় জমজমাট নৌ পথের যাত্রা

 প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬, ১২:৪৩ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

সদরঘাটের ওপর চাপ কমাতে বিকল্প দুয়ার: বসিলা ও শিমুলিয়ায় জমজমাট নৌ পথের যাত্রা

অনলাইন  ডেস্ক:

​পবিত্র ঈদুল আজহার আর মাত্র কয়েকটা দিন বাকি। এরই মধ্যে রাজধানী ছাড়তে শুরু করেছে ঘরমুখো মানুষ। প্রতি বছরই এই সময়ে ঢাকার প্রধান নদীবন্দর সদরঘাটে নামে উপচে পড়া মানুষের ঢল। তিল ধারণের জায়গা থাকে না পন্টুন থেকে শুরু করে টার্মিনালের প্রতিটি কোণায়। তবে এবার সেই চেনা দুর্ভোগের চিত্র বদলে দিতে এক অভিনব ও স্বস্তিদায়ক উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সদরঘাটের ওপর থেকে যাত্রী ও যানবাহনের তীব্র চাপ কমাতে আজ রবিবার (২৪ মে) থেকে রাজধানীর বসিলা এবং মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া লঞ্চঘাট থেকে এক বিশেষ লঞ্চ সার্ভিসের যাত্রা শুরু হয়েছে। এর ফলে দক্ষিণবঙ্গ ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলের যাত্রীদের জন্য ঈদযাত্রা যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি সদরঘাটের ওপর থেকেও এক বিশাল বোঝার উপশম ঘটেছে।

​এই নতুন দিগন্তের সূচনা ঘটে গতকাল শনিবার বিকেলে, যখন নৌপরিবহণ প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান হঠাৎ করেই সদরঘাট ও বসিলা লঞ্চঘাট পরিদর্শনে যান। মাঠপর্যায়ের সার্বিক প্রস্তুতি সচক্ষে দেখার পর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে এই নতুন রুটে বিশেষ লঞ্চ চলাচলের ঘোষণা দেন। আকস্মিক এই পরিদর্শনে প্রতিমন্ত্রীর সাথে নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ), বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্পোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তারা বসিলা ঘাটের অবকাঠামো এবং যাত্রীদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করেন।

​পরিদর্শন শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান বর্তমান সরকারের নৌ খাতের উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দেশের নৌযাত্রীদের নিরাপদ, আরামদায়ক ও সাশ্রয়ী যাতায়াত নিশ্চিত করতে বিগত কয়েক বছরে ব্যাপক সংস্কারমূলক কাজ হাতে নিয়েছে। তারই সুফল আজ সাধারণ মানুষ ভোগ করছে। এবারের ঈদযাত্রায় সবচেয়ে বড় চমক হচ্ছে ভাড়ার বিষয়টি। সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর নির্দেশনা থাকার কারণে এবার সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়েও কম মূল্যে যাত্রীদের পরিবহণ নিশ্চিত করা হচ্ছে। কোনো লঞ্চ মালিক যেন অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করতে না পারেন, সেজন্য প্রতিটি লঞ্চে ডিজিটাল ভাড়া তালিকা প্রদর্শনের ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর ফলে ঘাটের চেনা দালাল, হকার বা বুকিং সহকারীদের মাধ্যমে সাধারণ যাত্রীদের প্রতারিত হওয়ার আর কোনো সুযোগ থাকছে না।

​সাধারণত ঈদের সময় লঞ্চ টার্মিনালগুলোতে কুলি ও ট্রলি চালকদের সিন্ডিকেট এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের কারণে যাত্রীদের নাভিশ্বাস ওঠে। এই হয়রানি চিরতরে বন্ধ করতে এবার এক নজিরবিহীন মানবিক পদক্ষেপ নিয়েছে নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়। প্রতিমন্ত্রী জানান, ঈদের আগের ৫ দিন এবং পরের ৫ দিন—অর্থাৎ মোট ১০ দিন যাত্রীরা টার্মিনালগুলোতে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে কুলি ও ট্রলি সেবা পাবেন। এর জন্য নির্দিষ্ট স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রবীণ, অসুস্থ ও প্রতিবন্ধী যাত্রীদের যাতায়াতের সুবিধার্থে বিশেষ ক্যাডেটদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যারা ফ্রি হুইলচেয়ার সেবার মাধ্যমে অসহায় যাত্রীদের লঞ্চে উঠতে সাহায্য করছেন। মাঝনদীতে নৌকা বা ট্রলারের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণভাবে চলন্ত লঞ্চে ওঠানামার যে সংস্কৃতি এতকাল চলে আসছিল, তা কঠোরভাবে বন্ধ করা হয়েছে। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নদীতে নৌপুলিশ ও কোস্টগার্ডের সার্বক্ষণিক টহল জোরদার করা হয়েছে। এ ছাড়া পন্টুনে নিরাপদে ওঠার জন্য বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের সুবিধার্থে পূর্ব ও পশ্চিম পাশে দুটি নিচু ‘স্টেপ পন্টুন’ স্থাপন করা হয়েছে, যা এবারই প্রথম দেখা যাচ্ছে।

​টার্মিনাল এলাকার সার্বিক আইনশৃঙ্খলার কথা উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, হকারদের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণে নিয়মতান্ত্রিক তদারকি চালানো হচ্ছে। ঈদে যাত্রীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে পরিচ্ছন্নতার জন্য অতিরিক্ত জনবল মোতায়েন করা হয়েছে, যারা দিনরাত ঘাট এলাকা পরিষ্কার রাখছেন। পুরো লঞ্চের বোর্ডিং ব্যবস্থাপনা এবং পন্টুনের ভিড় নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে একটি আধুনিক ও প্রযুক্তি-নির্ভর ওয়াচ টাওয়ার কন্ট্রোল রুমের মাধ্যমে। সিসিটিভি ক্যামেরার সাহায্যে প্রতি মুহূর্তের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

​বসিলা ও শিমুলিয়া থেকে এই বিশেষ সার্ভিস চালু হওয়ার পর আজ সকাল থেকেই যাত্রীদের মাঝে এক অভূতপূর্ব সাড়া ও স্বস্তি দেখা গেছে। মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, মিরপুর ও সাভার এলাকার যাত্রীরা সদরঘাটের যানজট এড়িয়ে সহজেই বসিলা ঘাটে এসে লঞ্চে উঠছেন। প্রশাসনের এই কঠোর ও গোছানো প্রস্তুতি দেখে সাধারণ মানুষ বেশ সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তবে প্রশাসনের এই তৎপরতা যেন শুধু ঈদের প্রথম দিনগুলোতেই সীমাবদ্ধ না থাকে, সেই হুঁশিয়ারিও দিয়ে রেখেছেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি অত্যন্ত কড়া ভাষায় সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, যাত্রীসেবায় কোনো ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি বা অবহেলা কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না। নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল নৌযাত্রা নিশ্চিত করতে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে এবং কেউ এর ব্যত্যয় ঘটালে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারের এমন সমন্বিত উদ্যোগে এবার এক ভিন্নধর্মী, নিরাপদ ও আনন্দময় ঈদযাত্রার সাক্ষী হতে যাচ্ছে ঢাকাবাসী।

Advertisement
Advertisement
Advertisement