শিশুদের লাশের ভারে রাজু ভাস্কর্য: ড. ইউনূসের বিচারের দাবিতে উত্তাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশ আজ এক অভূতপূর্ব ও হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সাক্ষী হলো। সারিবদ্ধভাবে শুইয়ে রাখা হয়েছে ছোট ছোট সাদা কাফনে মোড়ানো শিশুদের প্রতীকী মরদেহ। সেই নিথর দেহের সারি ঘিরে ক্ষোভ আর আর্তনাদে ফেটে পড়লেন বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর নেতা-কর্মীরা। দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া হামের প্রকোপে তিন শতাধিক শিশুর মৃত্যুর দায়ে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এবং স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের বিচার দাবিতে এই ব্যতিক্রমী বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
বুধবার বিকেলে আয়োজিত এই সমাবেশে ছাত্রনেতারা অভিযোগ করেন, হামের এই ভয়াবহতা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং এটি তৎকালীন প্রশাসনের চরম অবহেলা ও ব্যর্থতার ফল—এক কথায় ‘মানবসৃষ্ট’ হত্যাকাণ্ড। বক্তারা ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, যখন দেশের ৫৮টি জেলায় হাম মহামারি আকার ধারণ করেছিল এবং শত শত পিতা তার সন্তানের মরদেহ নিয়ে দিগ্বিদিক ছুটছিলেন, তখন তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা বিদেশে উৎসবে মত্ত ছিলেন। সরকারি হিসাবেই তিন শতাধিক শিশুর প্রাণহানির পরও কেন হামকে ‘মহামারি’ ঘোষণা করে সর্বাত্মক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, সেই প্রশ্ন তোলা হয় রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশ থেকে।
বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর কেন্দ্রীয় সভাপতি দিলীপ রায় আক্ষেপ করে বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদ মুক্ত দেশে যে শিশুদের হাত ধরে আগামীর স্বপ্ন দেখার কথা ছিল, আজ তারাই লাশে পরিণত হচ্ছে। অথচ দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো থেকে শুরু করে তৌহিদি জনতা—কারোরই এই শিশুদের মৃত্যু নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। তারা যেন ওয়াশিংটনের তুষ্টির জন্য একযোগে নীরবতা পালন করছে।
সমাবেশে সাধারণ সম্পাদক জাবির আহমেদ জুবেল বর্তমান ও সাবেক—উভয় প্রশাসনের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “সাবেক সরকার মুনাফার লোভে শিশুদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিল, আর বর্তমান সরকারও একই উদাসীনতার পথে হাঁটছে। মনে হচ্ছে তারা অপেক্ষা করছে আর কত শত শিশুর প্রাণ ঝরলে তাদের ঘুম ভাঙবে।” বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প স্থাপনে ডাকসু নেতাদের আপত্তির সমালোচনা করে তিনি একে অমানবিক হিসেবে অভিহিত করেন।
ছাত্রনেত্রী নুজিয়া হাসান রাশা তার বক্তব্যে সরাসরি প্রধান উপদেষ্টা ও স্বাস্থ্য উপদেষ্টার বিচার দাবি করে বলেন, সংস্কারের দোহাই দিয়ে ড. ইউনূস নিজের স্বার্থসিদ্ধি করলেও শিশুদের জীবন রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে তিনি বলেন, যে বাবা তার সন্তানের লাশ নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছেন, তাকে সরকার শেষ পর্যন্ত কোন কার্ড দিয়ে সান্ত্বনা দেবে?
সমাবেশ থেকে অবিলম্বে হামকে জাতীয় মহামারি ঘোষণা করে তা প্রতিরোধে সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং শিশুদের এই ‘গণহত্যার’ জন্য দায়ী ব্যক্তিদের তদন্ত সাপেক্ষে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়। সাদা কাফনের সেই প্রতীকী লাশের মিছিল শেষে এক মৌন পদযাত্রা ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে, যা উপস্থিত সাধারণ শিক্ষার্থীদের মনে এক গভীর বিষাদ ও প্রশ্নের জন্ম দিয়ে যায়।