আকাশপথের সিংহাসন বদল: সাত বছরের খরা কাটিয়ে শীর্ষে বোয়িং, ইঞ্জিন সংকটে ডুবছে এয়ারবাস

 প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬, ০৭:০৩ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

আকাশপথের সিংহাসন বদল: সাত বছরের খরা কাটিয়ে শীর্ষে বোয়িং, ইঞ্জিন সংকটে ডুবছে এয়ারবাস

​নিজস্ব প্রতিবেদক

​আকাশপথের রাজত্ব নিয়ে বোয়িং ও এয়ারবাসের দীর্ঘদিনের যে দ্বৈরথ, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে এসে তা এক নাটকীয় মোড় নিয়েছে। ২০১৮ সালের সেই অভিশপ্ত ৭৩৭ ম্যাক্স বিপর্যয়ের পর কেটে গেছে দীর্ঘ সাতটি বছর। যান্ত্রিক ত্রুটি, একের পর এক তদন্ত আর বিশ্বজুড়ে আস্থার সংকটে যে বোয়িং একসময় অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে পর্যুদস্ত ছিল, তারা এখন ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠেছে। বছরের প্রথম তিন মাসের হিসাব বলছে, দীর্ঘদিনের আধিপত্য গুটিয়ে ইউরোপীয় জায়ান্ট এয়ারবাসকে পেছনে ফেলে উড়োজাহাজ সরবরাহের শীর্ষস্থানটি দখল করে নিয়েছে মার্কিন এই প্রতিষ্ঠান।

​বোয়িংয়ের এই অসাধ্য সাধনের নেপথ্যে রয়েছে কৌশলী পরিকল্পনা ও উৎপাদনের গতি বাড়ানো। বছরের প্রথম প্রান্তিকে তারা গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দিয়েছে ১৪৩টি উড়োজাহাজ, যা গত বছরের তুলনায় ১০ শতাংশেরও বেশি। বিশেষ করে ৭৩৭ ম্যাক্স এবং ৭৮৭ ড্রিমলাইনারের মতো জনপ্রিয় মডেলগুলোর সরবরাহ বৃদ্ধির মাধ্যমেই এই সাফল্য এসেছে। এই জোয়ারের ঢেউ লেগেছে দেশের আকাশেও; সম্প্রতি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসও তাদের বহরে যুক্ত করতে বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি নতুন উড়োজাহাজের চুক্তি সম্পন্ন করেছে। মার্কিন নিয়ন্ত্রক সংস্থা এফএএ-এর কড়া বিধিনিষেধ উঠে যাওয়া এবং মাসিক উৎপাদন ৪২টিতে উন্নীত করা বোয়িংয়ের এই আকাশছোঁয়া ফেরার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে।

​অন্যদিকে, যখন বোয়িং উদযাপনে মগ্ন, তখন তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী এয়ারবাস পার করছে এক চরম অস্থির সময়। গত বছরের তুলনায় তাদের উড়োজাহাজ সরবরাহের হার ১৬ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১১৪টিতে। তবে এয়ারবাসের এই পিছুটানের কারণ কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি নয়, বরং এক ভয়াবহ 'ইঞ্জিন সংকট'। প্র্যাট অ্যান্ড হুইটনি ইঞ্জিনের সরবরাহে টান পড়ায় এয়ারবাসের অ্যাসেম্বলি লাইন থেকে নতুন বিমান তৈরি হয়ে বের হলেও সেগুলোতে ইঞ্জিন বসানো যাচ্ছে না। ফলে শত শত উড়োজাহাজ এখন রানওয়েতে অলস পড়ে থেকে কেবল রোদ পোহাচ্ছে।

​এয়ারবাসের প্রধান নির্বাহী গুইলাম ফাউরি এই সময়টিকে প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে অন্যতম কঠিন সময় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক যে, নতুন বিমান তৈরির চেয়ে এখন মাটিতে পড়ে থাকা সাড়ে পাঁচশ বিমানের ইঞ্জিন মেরামতকেই তাদের বেশি গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে তাদের পকেটেও; কোম্পানির মুনাফা এক ধাক্কায় ৫২ শতাংশ কমে ৩০০ মিলিয়ন ইউরোতে নেমে এসেছে।

​তবে বোয়িং এই সাময়িক জয়ে স্বস্তিতে থাকলেও দীর্ঘমেয়াদী লড়াই এখনো অনেকটা বাকি। কারণ এয়ারবাসের ঝোলায় এখনো সাত হাজারেরও বেশি ন্যারো-বডি উড়োজাহাজের অর্ডার জমা আছে, যা বোয়িংয়ের চেয়ে অনেক বেশি। ২০২৬ সালের মধ্যে ৮৭০টি বিমান সরবরাহের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে তারা। বিমান শিল্পের এই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই এখন এক নতুন সমীকরণে এসে দাঁড়িয়েছে—একদিকে বোয়িংয়ের হারানো গৌরব ফিরে পাওয়ার লড়াই, অন্যদিকে সাপ্লাই চেইনের চ্যালেঞ্জ সামলে এয়ারবাসের আবার শীর্ষে ফেরার সংকল্প। আকাশপথের এই সিংহাসন দখলের লড়াই শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Advertisement
Advertisement
Advertisement