সার্বভৌমত্ব নাকি অসম বাণিজ্য? এআরটি চুক্তির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট

 প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬, ১২:৪১ পূর্বাহ্ন   |   জাতীয়

সার্বভৌমত্ব নাকি অসম বাণিজ্য? এআরটি চুক্তির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট

আদালত প্রতিবেদক | ঢাকা

​ফেব্রুয়ারির শীতলক্ষ্মা হাওয়া তখনো কাটেনি, গত ৯ ফেব্রুয়ারি যখন বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সই হলো ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোক্যাল ট্রেড’ বা এআরটি (ART)। আপাতদৃষ্টিতে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের নতুন দিগন্ত মনে হলেও, সই হওয়ার পর থেকেই এই চুক্তি নিয়ে বইছে আলোচনার ঝড়, তৈরি হয়েছে নানা বিতর্ক। সেই বিতর্কের জল এবার গড়াল উচ্চ আদালত পর্যন্ত।

​একটি অসম লড়াইয়ের সমীকরণ

​আইনজীবীদের ভাষ্যমতে, এই চুক্তির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর অসমতা। সোমবার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ মাইদুল ইসলামের পক্ষে অ্যাডভোকেট সুবীর নন্দী দাস হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় এই রিটটি দায়ের করেন।

​চুক্তিটির ব্যবচ্ছেদ করতে গিয়ে আইনজীবী সুবীর নন্দী দাস জানান, এটি যেন একটি ‘অসম যুদ্ধের’ নীল নকশা। তিনি বলেন,

​"চুক্তিটি আপাতদৃষ্টিতে বাংলাদেশের অর্থনীতির টুঁটি চেপে ধরার মতো। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে মাত্র ৬টি বিষয়ে বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে ১৩১টি শর্ত বা বাধ্যবাধকতা।"

কেন এই আইনি চ্যালেঞ্জ?

​রিট আবেদনে মূলত তিনটি জোরালো যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে:

​১. জাতীয় স্বার্থ ও অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব: চুক্তির শর্তগুলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বকে খর্ব করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শর্তের বেড়াজালে দেশের দেশীয় শিল্প ও বাজারব্যবস্থা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

​২. জনস্বার্থের পরিপন্থী: রিটকারীর দাবি, এই চুক্তি কেবল নথিপত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, এর প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দেশের জনকল্যাণ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।

​৩. অযৌক্তিক বৈষম্য: ১৩১ বনাম ৬—এই পরিসংখ্যানটিকেই রিটের প্রধান ভিত্তি করা হয়েছে। কেন একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ এত বেশি বাধ্যবাধকতা মেনে নিল, সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

​আদালতের কাঠগড়ায় যা চাওয়া হয়েছে

​রিট আবেদনে গত ৯ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত সেই এআরটি চুক্তিকে কেন 'অবৈধ' ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারির আর্জি জানানো হয়েছে। এছাড়া রুল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় যাতে চুক্তির বিধান অনুযায়ী দুই দেশের মধ্যে কোনো লিখিত নোটিফিকেশন আদান-প্রদান বা বাস্তবায়ন কার্যক্রম না চলে, সেজন্য নিষেধাজ্ঞার দাবিও করা হয়েছে।

​রিটে বিবাদী করা হয়েছে সরকারের প্রভাবশালী তিন মন্ত্রণালয়—পররাষ্ট্র, অর্থ এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবকে।

​এরপর কী?

​চুক্তিটি নিয়ে শুরু থেকেই অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক মহলে কানাঘুষা চলছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তড়িঘড়ি করে এমন একটি সুদূরপ্রসারী চুক্তি কেন সই হলো, তা নিয়ে জনমনে কৌতূহল ছিল তুঙ্গে। হাইকোর্টের বিচারপতি আহমেদ সোহেলের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে আগামীকাল মঙ্গলবার (৬ মে) রিটটি শুনানির জন্য উত্থাপন করার কথা রয়েছে।

​এখন সবার চোখ উচ্চ আদালতের দিকে। এই আইনি লড়াই কি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক গতিপথ বদলে দেবে, নাকি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জটিল মারপ্যাঁচে এটি কেবল একটি নতুন অধ্যায় হয়ে থাকবে—তার উত্তর মিলবে আদালতের রায়ে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement