স্বপ্নভঙ্গের সাভার: বর্জ্য পরিশোধনাগারের অভাবে তলানিতে চামড়া শিল্প
নিজস্ব প্রতিবেদক হাজারীবাগের ট্যানারিগুলো যখন সাভারের হেমায়েতপুরে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তখন এই শিল্পকে ঘিরে দেখা দিয়েছিল এক নতুন দিগন্তের হাতছানি। আধুনিক পরিবেশবান্ধব শিল্পনগরী হবে, বিশ্ববাজারের বড় বড় ক্রেতারা লাইন ধরবে বাংলাদেশি চামড়ার জন্য—এমনই এক স্বপ্ন বুনেছিলেন ট্যানারি মালিকরা। কিন্তু ২০১৬ সালের সেই স্থানান্তর প্রক্রিয়ার প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও আজ সেই স্বপ্ন যেন বিবর্ণ ধূসর হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের বারবার আশ্বাস সত্ত্বেও সাভারে আজও গড়ে ওঠেনি একটি কার্যকর ও আধুনিক কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি)। আর এই একটিমাত্র কাঠামোগত দুর্বলতার বলি হচ্ছে দেশের সম্ভাবনাময় চামড়া রপ্তানি খাত।
সাভারের ট্যানারিপল্লিতে গেলেই চোখে পড়ে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। কোটি কোটি টাকা খরচ করে ব্যবসায়ীরা কারখানা গড়ে তুললেও চারপাশের পরিবেশ যেন থমকে আছে সেই মান্ধাতা আমলেই। সিইটিপি কার্যকর না হওয়ায় ট্যানারিগুলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করতে পারছে না। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চামড়া তার আভিজাত্য ও কদর হারিয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপ ও আমেরিকার নামী সব বায়াররা এখন বাংলাদেশের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড অর্গানাইজেশন বা লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডাব্লিউজি) পরিবেশ স্বীকৃতি সনদ ছাড়া এসব বাজারে প্রবেশের কোনো সুযোগ নেই। অথচ বর্তমানে দেশের ১৫৫টি ট্যানারির মধ্যে মাত্র ৪-৫টি কারখানা এই সনদ অর্জনে সক্ষম হয়েছে।
রপ্তানি খাতের এই ধসের চিত্র এখন পরিসংখ্যানের পাতায় স্পষ্ট। একসময় যেখানে বছরে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার আয় আসত, এখন তা কমে ১২০ মিলিয়ন ডলারে এসে ঠেকেছে। ইউরোপের বাজার হারিয়ে আমাদের এখন একচেটিয়া নির্ভর করতে হচ্ছে চীনের ওপর। কিন্তু সেই সুযোগ নিচ্ছে চীনা বায়াররা। তারা নন-কমপ্ল্যায়ান্ট হওয়ার অজুহাতে বাংলাদেশি চামড়া কিনছে পানির দরে। এর ফলে ট্যানারি মালিকরা একদিকে যেমন ঋণের চাপে পিষ্ট হচ্ছেন, অন্যদিকে দেশ বঞ্চিত হচ্ছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা থেকে।
সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, বাংলাদেশ যখন নিজের চামড়া বিদেশে রপ্তানি করতে পারছে না, তখন দেশি কারখানাগুলো চামড়াজাত পণ্য তৈরির জন্য বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ চামড়া আমদানি করছে। বছরে প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে এই আমদানি করতে হচ্ছে, কারণ দেশি চামড়ার মান আন্তর্জাতিক বায়ারদের চাহিদা অনুযায়ী পরিশোধিত নয়। একদিকে দেশি সম্পদ পচে নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে দেশের ডলার চলে যাচ্ছে বিদেশে—এই দ্বিমুখী সংকটে ধুঁকছে দেশের অর্থনীতি।
মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। প্রতি বছর কোরবানির মৌসুমে সারা দেশে কোটি কোটি টাকার চামড়া নষ্ট হয়ে যাওয়ার খবর আসে। বিশেষ করে চট্টগ্রামে পশুর চামড়া সংরক্ষণের উপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকায় আড়তদারদের নাভিশ্বাস উঠছে। একসময়ের ২০-২১টি ট্যানারি এখন একটিতে এসে ঠেকেছে। ফলে কাঁচা চামড়ার দাম নির্ধারণ নিয়ে প্রতি বছর যে নাটকীয়তা দেখা যায়, তার মূলে রয়েছে এই অবকাঠামোগত অভাব। ট্যানারি মালিকরা ব্যাংক ঋণ পেলেও আড়তদাররা সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত, ফলে নগদে কেনা চামড়া তারা ট্যানারির কাছে বাকিতে বিক্রি করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছেন।
বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি টিপু সুলতান ও ট্যানারি মালিকদের ভাষ্যে উঠে এসেছে চরম হতাশার সুর। তাদের দাবি স্পষ্ট—যতদিন পর্যন্ত সিইটিপি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করে পরিবেশবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা না যাবে, ততদিন রপ্তানির বাজার পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। চামড়া শিল্পের এই মৃতপ্রায় অবস্থাকে বাঁচাতে হলে শুধু আশ্বাস নয়, বরং সাভার ট্যানারিপল্লিকে প্রকৃত অর্থেই আন্তর্জাতিক মানের করে তোলার জন্য কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, ‘দেশের সম্পদ’ হিসেবে পরিচিত এই চামড়া শিল্প অচিরেই ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যেতে পারে।