অনন্য সাহস ও সংগ্রামের বাতিঘর: শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ৯৭তম জন্মবার্ষিকী আজ
নিজস্ব প্রতিবেদক:
অন্যায় ও অপশক্তির বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামের প্রতীক, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাতিঘর—শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। আজ রোববার (৩ মে) এই মহীয়সী নারীর ৯৭তম জন্মবার্ষিকী। ১৯২৯ সালের এই দিনে অবিভক্ত বাংলার মুর্শিদাবাদ জেলার সুন্দরপুর গ্রামে এক আলোকিত পরিবারে তাঁর জন্ম হয়।
শিক্ষাজীবন ও কর্মপেশা: এক আধুনিক মনন
রক্ষণশীল সমাজের বেড়াজাল ডিঙিয়ে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পিতা আবদুল আলীর হাত ধরে তিনি আধুনিক শিক্ষায় দীক্ষিত হন। ১৯৪৫ সালে কলকাতার লেডি ব্রাবোর্ন কলেজ থেকে বিএ এবং ১৯৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। কর্মজীবনে তিনি ছিলেন এক নিষ্ঠাবান শিক্ষক। ১৯৫২ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ফুলব্রাইট স্কলার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ শেষে ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে শিক্ষকতা করেছেন তিনি।
‘একাত্তরের দিনগুলি’: একাত্তরের জীবন্ত দলিল
জাহানারা ইমামের অমর সৃষ্টি ‘একাত্তরের দিনগুলি’। ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে তিনি নিজের জ্যেষ্ঠ পুত্র শাফী ইমাম রুমী ও স্বামী শরীফ ইমামকে হারিয়েছেন। সেই অবর্ণনীয় শোক বুকে চেপে তিনি যে দিনলিপি লিখে গেছেন, তা আজ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্য দলিল। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থটি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে শিখিয়েছে দেশপ্রেমের অমোঘ মন্ত্র।
গণ-আদালত ও ঘাতক-দালাল নির্মূল আন্দোলন
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দেশ যখন মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তির ষড়যন্ত্রের মুখে পড়ে, তখন তিনি কেবল কলম ধরেননি, নেমে এসেছিলেন রাজপথে। ১৯৯২ সালে তাঁর নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি’। দেশের বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিকর্মী ও তরুণ সমাজকে এককাতারে এনে তিনি গঠন করেন ঐতিহাসিক ‘গণ-আদালত’। রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা, সরকারের হুমকি ও মরণব্যাধি ক্যানসার—কোনো কিছুই এই লড়াকু নারীকে সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি।
প্রয়াণ
আজীবন সংগ্রামের পথ চলা শেষে ১৯৯৪ সালের ২৬ জুন যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরকালে পাড়ি জমান এই মহীয়সী নারী। ৯৭তম জন্মবার্ষিকীতে শহীদ জননীকে জানাই গভীর বিনম্র শ্রদ্ধা। তাঁর দেখানো পথেই অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ গড়ার শপথ আজও অম্লান।