মুখস্থবিদ্যার দিন শেষ: আসছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ‘স্মার্ট ক্লাসরুম’, যুক্ত হবে ক্লাউড প্রযুক্তি

 প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৬, ০১:২৬ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

মুখস্থবিদ্যার দিন শেষ: আসছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ‘স্মার্ট ক্লাসরুম’, যুক্ত হবে ক্লাউড প্রযুক্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা | ৩ মে, ২০২৬: 

মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা ব্যবস্থাকে বিশ্বমানের করে গড়ে তুলতে আমূল পরিবর্তনের পথে হাঁটছে বাংলাদেশ। প্রচলিত মুখস্থনির্ভর পড়াশোনার বদলে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল ও প্রযুক্তিগত দক্ষতায় গড়ে তুলতে সরকারের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) গ্রহণ করেছে এক উচ্চাভিলাষী ‘স্মার্ট ক্লাসরুম’ প্রকল্প। চীন সরকারের আর্থিক অনুদান ও কারিগরি সহায়তায় বাস্তবায়িত হতে যাওয়া এই প্রকল্পটি দেশের শিক্ষা খাতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রকল্পের মূল বৈশিষ্ট্য ও লক্ষ্য

প্রস্তাবিত ১৩৫ কোটি টাকার এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো ডিজিটাল বিভাজন কমিয়ে প্রান্তিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদেরও মানসম্মত শিক্ষার আওতায় আনা। প্রকল্পের আওতায় দেশের ১৫০টি সরকারি-বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৩০০টি অত্যাধুনিক ‘স্মার্ট ক্লাসরুম’ তৈরি করা হবে।

কী থাকছে এই স্মার্ট ক্লাসরুমে?

 ইন্টারেক্টিভ এডুকেশন প্যানেল (আইইপি): প্রতিটি স্কুলে থাকবে দুটি করে আধুনিক আইইপি, যা পাঠদানকে করবে আকর্ষণীয় ও কার্যকর।

স্বয়ংক্রিয় এআই রেকর্ডিং: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে অভিজ্ঞ শিক্ষকদের ক্লাস স্বয়ংক্রিয়ভাবে রেকর্ড করা হবে। ফলে শিক্ষার্থীরা ক্লাসে উপস্থিত থাকতে না পারলেও পরবর্তীতে তা দেখে নিতে পারবে।

 ক্লাউড প্ল্যাটফর্ম ও কিউআর কোড: ক্লাউড প্রযুক্তির মাধ্যমে ক্লাসের নোট ও কোর্সওয়্যারগুলো অনলাইনে সংরক্ষিত থাকবে। শিক্ষার্থীরা কিউআর কোড স্ক্যান করেই মুহূর্তের মধ্যে তা নিজের ডিভাইসে সংগ্রহ করতে পারবে।

কেন্দ্রীয় ডাটা সেন্টার: মাউশি প্রাঙ্গণে স্থাপন করা হবে একটি অত্যাধুনিক নেটওয়ার্কিং ও ক্লাউড বেইজড ডাটা সেন্টার, যা সারা দেশের স্মার্ট শিক্ষাদান কার্যক্রমকে একটি নেটওয়ার্কের আওতায় আনবে।

পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু

মূল প্রকল্পের বাইরেও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার প্রসারে সরকার ‘এক শ্রেণিকক্ষ, এক স্মার্ট বোর্ড এবং এক শিক্ষক, এক ট্যাব’ শীর্ষক একটি পাইলট প্রকল্প হাতে নিয়েছে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ের সহায়তায় ইতিমধ্যে বগুড়ার ‘বেতগাড়ী মীর শাহ আলম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়’ এবং চাঁদপুরের ‘ওবায়দুল হক উচ্চ বিদ্যালয়’-এ এই কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সফল হলে পর্যায়ক্রমে সারা দেশে এটি বিস্তৃত করা হবে।

কবে নাগাদ বাস্তবায়ন?

মাউশির তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই (ফিজিবিলিটি স্টাডি) ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এখন ‘টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল’ (টিএপিপি) তৈরির কাজ চলছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা কমিশনের প্রক্রিয়া শেষে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরু থেকেই মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞ মতামত

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল জানান, “দেশের মাধ্যমিক শিক্ষাকে আধুনিক ও প্রযুক্তিগতভাবে সমৃদ্ধ করতে চীন সরকার ব্যাপক আগ্রহ দেখিয়েছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতিটি স্কুলে বিশ্বমানের সুবিধা নিশ্চিত করা হবে।”

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই উদ্যোগ ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বিনির্মাণে শিক্ষার্থীদের নতুন প্রজন্মের উপযোগী দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তুলবে। এটি শিক্ষার্থীদের পাঠ্যপুস্তকের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্লেষণধর্মী জ্ঞান আহরণে উৎসাহিত করবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, বরং এই প্রকল্পটির যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও শিক্ষকদের সঠিক প্রশিক্ষণের ওপর নির্ভর করছে এর চূড়ান্ত সাফল্য। সব মিলিয়ে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরু হতে যাওয়া এই উদ্যোগটি বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে এক যুগান্তকারী অধ্যায় হতে যাচ্ছে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement