জলাবদ্ধতা নিরসনে হাজার কোটির প্রকল্প: আশ্বাসের জোয়ারে ভাসছে নগরবাসী, না কি কেবলই অর্থের অপচয়?
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
ক্যালেন্ডারের পাতায় বর্ষা আসতে এখনো কিছুটা দেরি, কিন্তু মে মাসের প্রথম বৃষ্টিতেই রাজধানী ঢাকার চিরচেনা রূপ ফুটে উঠেছে। রাজারবাগ থেকে নিউমার্কেট—রাজধানীর রাজপথগুলো যেন একেকটি ছোটখাটো নদীতে পরিণত হয়েছে। হাঁটু সমান পানিতে নাকাল নগরবাসীর মনে এখন একটাই প্রশ্ন: প্রতি বছর হাজার কোটি টাকা খরচ হলেও কেন বৃষ্টির জল সরতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়? না কি প্রতি বছরের মতো এবারও উন্নয়নের নামে জনগণের করের টাকা কেবল ড্রেনেই ভেসে যাবে?
রাজধানীর মিরপুরের কাজীপাড়া এলাকা দিয়ে হাঁটলে এখন বোঝার উপায় নেই এটি কোনো ব্যস্ত সড়ক না কি কোনো যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকা। জলাবদ্ধতা নিরসন আর ড্রেন সংস্কারের নামে গত এক মাস ধরে চলছে খোঁড়াখুঁড়ি। কিন্তু এই সংস্কার কাজ জনজীবনে আশীর্বাদের চেয়ে দুর্ভোগই বয়ে এনেছে বেশি। কোথাও উপড়ে পড়া বৈদ্যুতিক খুঁটি মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আবার কোথাও খোলা ড্রেন পার হতে গিয়ে ঘটছে দুর্ঘটনা। স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানাচ্ছেন, ড্রেনের ওপর রাখা সরু বাঁশ বেয়ে যাতায়াত করতে গিয়ে অনেকেই নিয়মিত নিচে পড়ে আহত হচ্ছেন। দ্রুত এই নরকযন্ত্রণা থেকে মুক্তির দাবি তাদের।
তবে ভোগান্তির চেয়েও বড় প্রশ্ন উঠেছে প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিয়ে। কাজীপাড়ার স্থানীয়রা অবাক বিস্ময়ে দেখছেন, পুরনো পাইপগুলো অক্ষত থাকা সত্ত্বেও সেগুলোকে বদলে নতুন পাইপ বসানো হচ্ছে। বিস্ময়কর তথ্য হলো, পুরনো পাইপের সাথে নতুন পাইপের ব্যাসের পার্থক্য মাত্র ছয় ইঞ্চি! প্রকৌশলগতভাবে এই সামান্য পার্থক্যে বিশাল কোনো জলরাশি দ্রুত সরে যাওয়া সম্ভব নয় বলেই ধারণা বিশ্লেষকদের। অথচ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এই ছোটখাটো পরিবর্তনের টেন্ডারের জন্য বরাদ্দ দিয়েছে ১২ থেকে ৩৮ কোটি টাকা।
২০২৪ থেকে ২০২৬ অর্থ বছরের বাজেট নথির দিকে তাকালে চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসন, ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং খাল রক্ষণাবেক্ষণে দুই সিটি করপোরেশন মিলে প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে। বিশাল এই অংকের টাকা ব্যয়ের আশ্বাস দিয়ে ঢাকা উত্তর সিটির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান দাবি করেন, বিগত ১৫ বছর ধরে সঠিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাবে এই স্থবিরতা তৈরি হয়েছে, যা তারা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণের প্রশাসক আব্দুস সালাম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, উন্নয়ন কাজে কোনো প্রকার অনিয়ম হলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
তবে নগর পরিকল্পনাবিদদের কণ্ঠে ঝরছে চরম হতাশা। বিশিষ্ট নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান মনে করেন, মূল সমস্যার সমাধান না করে কেবল টাকার ছড়াছড়ি কোনো কাজে আসবে না। তার মতে, পুরো ড্রেনেজ নেটওয়ার্কের সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং ময়লা জমে থাকা বন্ধ করার দিকে কর্তৃপক্ষের কোনো আগ্রহ নেই। যথাযথ সমন্বয় ও কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করলে হাজার কোটি টাকা খরচ করেও ঢাকাবাসীর ভাগ্য বদলাবে না।
একদিকে যখন নগরের ড্রেনেজ নিয়ে হাহাকার, তখন অন্যদিকে দেশের কৃষি অবকাঠামোতে কিছুটা আশার আলো দেখা যাচ্ছে। সার সংরক্ষণ ও সুষ্ঠু বিতরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ৩৪টি আধুনিক বাফার সার গুদাম নির্মাণের কাজ দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে। কৃষকের দোরগোড়ায় দ্রুত সার পৌঁছে দিতে এই প্রকল্পটি মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কিন্তু রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিয়ে যে সংশয় তৈরি হয়েছে, তাতে নগরবাসীর মনে শঙ্কা কাটছে না। পরিকল্পনাহীন খোঁড়াখুঁড়ি আর লোকদেখানো পাইপ পরিবর্তনের এই সংস্কৃতি থেকে ঢাকা কবে মুক্তি পাবে, তার উত্তর এখনো কারো জানা নেই। ঢাকার উন্নয়ন কি কেবল বর্ষার আগের এই "তড়িঘড়ি উৎসবে" সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এবার সত্যিই সুপরিকল্পিত কোনো সমাধান আসবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।