জুলাইয়ে আসছে নতুন পে-স্কেল: স্বপ্ন ও সংকটের দোলাচলে ২২ লাখ সরকারি কর্মচারী
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অপেক্ষার প্রহর গুনছেন দেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। জীবনযাত্রার আকাশচুম্বী ব্যয় আর মুদ্রাস্ফীতির চাপে যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, ঠিক তখনই আশার আলো হয়ে আসছে ‘নবম পে-স্কেল’। তবে এই প্রাপ্তি কেবল একটি সরকারি ঘোষণা নয়, বরং এর পেছনে লুকিয়ে আছে লাখ লাখ পরিবারের দীর্ঘশ্বাস আর বাঁচার আকুতি।
বাজেটের অপেক্ষায় ২২ লাখ পরিবার
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে সামনে রেখে এখন সর্বত্র আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নতুন বেতন কাঠামো। সরকারি সূত্রগুলো বলছে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সাথে পাল্লা দিতে হিমশিম খাওয়া নিম্ন গ্রেডভুক্ত কর্মচারীদের কথা বিবেচনা করে সরকার নীতিগতভাবে পে-স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় বেতন কমিশন ও পুনর্গঠিত যাচাই-বাছাই কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, আগামী ১ জুলাই থেকেই এই নতুন স্কেল কার্যকর হতে পারে। তবে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর চাপ কমাতে এটি একবারে নয়, বরং ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। যার প্রথম ধাপে মূল বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।
অসন্তোষ ও আন্দোলনের ডাক
সরকার বেতন বাড়ানোর প্রস্তুতি নিলেও মাঠপর্যায়ে কর্মচারীদের মধ্যে বিরাজ করছে চাপা ক্ষোভ। দীর্ঘ ১১ বছর ধরে বেতন বৈষম্যের শিকার হওয়া কর্মচারীরা এখন রাজপথে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারী কল্যাণ সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির কণ্ঠে ঝরে পড়ছে বঞ্চনার সুর। সংগঠনের আহ্বায়ক আবদুল মালেক এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, দীর্ঘ ১১ বছরে দুটি পে-স্কেল পাওয়ার কথা থাকলেও তারা একটিও পাননি। ঋণের জালে জর্জরিত কর্মচারীদের বেতন মাসের ১০-১৫ দিন যেতেই শেষ হয়ে যায়। বাকি দিনগুলো কাটে চরম অনিশ্চয়তায়।
এই দাবি আদায়ে মে মাসজুড়ে তারা ঘোষণা করেছেন নানা কর্মসূচি। আগামী ৮ মে পটুয়াখালী এবং ৯ মে খুলনায় প্রতিনিধি সমাবেশের মাধ্যমে তৃণমূলের দাবি জনসমক্ষে আনা হবে। কর্মসূচির চূড়ান্ত রূপ দেখা যাবে ১৬ মে, যখন রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সমাবেশ ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হবে।
প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা
কর্মচারী নেতাদের দাবি, এবারের বাজেটে বরাদ্দ রেখে যদি পে-স্কেল বাস্তবায়ন না করা হয়, তবে ২২ লাখ পরিবারের মধ্যে যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হবে, তা সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে। তাদের বিশ্বাস, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্মচারীদের এই মানবিক আবেদনটি সদয় দৃষ্টিতে দেখবেন। নতুন পে-স্কেল কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি দেশের ২২ লাখ পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর এক বড় উপলক্ষ।
কমিটির সুপারিশ ও আগামীর পথ
গত ২১ এপ্রিল সরকার যে উচ্চপর্যায়ের কমিটি পুনর্গঠন করেছিল, তারা ইতিমধ্যে তাদের মতামত জমা দিয়েছে। সেখানে আধুনিক জীবনযাত্রার ব্যয়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বেতন কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, আসন্ন জুন মাসের বাজেটে অর্থমন্ত্রী কর্মচারীদের এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে কতটুকু সুসংবাদ দিতে পারেন।
সব মিলিয়ে, রাজপথের আন্দোলন আর নীতি-নির্ধারকদের টেবিলের ফাইল—এই দুইয়ের মাঝে ঝুলে আছে দেশের লাখ লাখ সরকারি কর্মচারীর ভাগ্য। ১ জুলাই কি সত্যি তাদের জীবনের নতুন কোনো দিগন্ত উন্মোচন করবে? উত্তর মিলবে বাজেট অধিবেশনের শেষলগ্নে।