পরিবহন খাতে বছরে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি: কার্যকর তদারকি ও আইন প্রয়োগ জোরদারের তাগিদ
নিজস্ব প্রতিবেদক:
দেশের পরিবহন খাতে বিদ্যমান অনিয়ম, দুর্বল নজরদারি এবং আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়নের অভাবে সরকার প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, প্রতিবছর প্রায় ৩ হাজার ৫১৭ কোটি টাকার সম্ভাব্য রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার, যা যথাযথ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করা সম্ভব।
বর্তমানে মোটরসাইকেল, থ্রি-হুইলার, বাস-মিনিবাস, ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান এবং প্রাইভেট কার—এই পাঁচটি প্রধান খাত থেকে সরকারের বার্ষিক রাজস্ব আয় আনুমানিক ৩ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা। তবে কার্যকর আইন প্রয়োগ, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে এ আয় প্রায় ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় উন্নীত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফিটনেসবিহীন, নিবন্ধনহীন এবং মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহনের অবাধ চলাচলই রাজস্ব ক্ষতির অন্যতম প্রধান কারণ। পাশাপাশি রুট পারমিট ছাড়া যান চলাচল, কর ফাঁকি এবং তদারকির ঘাটতিও এ সমস্যাকে জটিল করে তুলছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, দেশে প্রায় ৫ লাখ ৬৮ হাজার নিবন্ধিত যানবাহনের ফিটনেস সনদ নেই এবং প্রতিবছর এই সংখ্যা ২০ থেকে ৩০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোটরসাইকেল খাতে বর্তমান আয় প্রায় ১,৩৬০ কোটি টাকা হলেও সম্ভাব্য আয় ২,০০০ কোটির বেশি; এ খাতে ক্ষতি প্রায় ৬৪১ কোটি টাকা। থ্রি-হুইলার খাতে বর্তমান আয় ৩৬২ কোটি টাকা হলেও সম্ভাব্য আয় ৮৮০ কোটি টাকা, যেখানে ক্ষতি প্রায় ৫১৭ কোটি টাকা। ব্যাটারিচালিত ইজি বাইক খাতে বর্তমান আয় মাত্র ১৭ দশমিক ৫ কোটি টাকা হলেও সম্ভাব্য আয় ৯০৫ কোটি টাকা; এ খাতে প্রায় ৮৮৮ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে। এছাড়া বাস ও মিনিবাস খাতে বর্তমান আয় ১৯৮ কোটি টাকা হলেও সম্ভাব্য আয় ৬৭০ কোটি টাকা এবং ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান খাতে বর্তমান আয় ২৭৫ কোটি টাকা হলেও সম্ভাব্য আয় ৬৯৭ কোটি টাকা। প্রাইভেট কার খাতে কর ফাঁকি ও ফিটনেস নবায়নের অভাবে প্রায় ৫৬০ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে।
এ ধরনের অনিয়ম শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; পরিবেশ দূষণ ও সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও তা বিরূপ প্রভাব ফেলছে। ধারণা করা হয়, পুরনো ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন রাজধানীর বায়ুদূষণের উল্লেখযোগ্য অংশের জন্য দায়ী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর প্রায় ৩১ হাজার ৫৭৮ জন সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান, যেখানে অননুমোদিত ও অযোগ্য যানবাহন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ হিসেবে চিহ্নিত।
বিদ্যমান আইন অনুযায়ী বাস, ট্রাক ও থ্রি-হুইলারের নির্ধারিত অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল রয়েছে এবং ফিটনেস সনদ গ্রহণ বাধ্যতামূলক। মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন অপসারণের বিধানও রয়েছে। তবে এসব বিধান বাস্তবায়নে কার্যকর তদারকির ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নিবন্ধন, ফিটনেস, কর এবং রুট পারমিট সংক্রান্ত তথ্যের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব থাকায় অনেক যানবাহন নজরদারির বাইরে থেকে যাচ্ছে এবং রাজস্ব আদায়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে।
পরিস্থিতির উন্নয়নে সংশ্লিষ্টরা নিবন্ধন ও ফিটনেস নবায়ন শতভাগ নিশ্চিত করা, অনিবন্ধিত যানবাহনকে আইনের আওতায় আনা, রুট পারমিট ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল করা, সমন্বিত ডেটাবেইস গড়ে তোলা, নজরদারি ও মোবাইল কোর্ট জোরদার করা এবং স্ক্র্যাপ নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
পরিশেষে বলা যায়, পরিবহন খাত দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে রাজস্ব আয়ের বড় উৎস হতে পারে। এ খাতের সম্ভাবনা পূর্ণাঙ্গভাবে কাজে লাগাতে হলে কার্যকর নীতি বাস্তবায়ন, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা এবং কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা অপরিহার্য।